পাঁচ বছরে বস্তিতে ১২০০ অগ্নিকাণ্ড ; সরকার বলছে- এগুলোর জন্য কেউ দায়ী নয়!

প্রবাসীর দিগন্ত | প্রবাসীরদিগন্ত ডেস্ক : মার্চ ২০, ২০১৮

সুজিত সাহা ও নিহাল হাসনাইন :বস্তিতে নিয়মিত বিরতিতে অগ্নিকাণ্ড ঘটলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মামলা হয় না। হতাহত হলেই কেবল মামলা হয়, তাও অপমৃত্যুর। এরও আবার তদন্ত হয় না। গত পাঁচ বছরে দেশের বস্তিগুলোয় ১ হাজার ২০০টির বেশি অগ্নিকাণ্ড ঘটলেও একটিরও অভিযোগপত্র দাখিল করেনি পুলিশ। স্বাভাবিকভাবেই এসব অগ্নিকাণ্ডে  কাউকে দায়ীও করা যায়নি।

যদিও নগর অর্থনীতিতে উল্লেখ করার মতো অবদান রাখছে বস্তি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ বস্তি শুমারি অনুযায়ী, বস্তির বাসিন্দাদের ১৩ শতাংশের বেশি দেশের প্রধান রফতানি খাত পোশাক শিল্পের কর্মী।

এসব বস্তিতে একের পর এক অগ্নিকাণ্ড ঘটলেও দোষীদের চিহ্নিত করতে না পারার কারণ হিসেবে নানা সীমাবদ্ধতার কথা বলছে পুলিশ। তাদের মতে, হত্যাকাণ্ডের তদন্তে পুলিশ যেসব ক্লু পায়, বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রে তা পাওয়া যায় না। এছাড়া বস্তিগুলোয় সিসি ক্যামেরাও থাকে না, যা থেকে অপরাধীদের শনাক্ত করা যায়।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) সহেলী ফেরদৌস এ প্রসঙ্গে এই প্রতিবেদককে বলেন, আগুন লাগানোর পর অপরাধের সব আলামতই নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে অপরাধী শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। আগুনের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাগুলো তদন্তেও কিছুটা সময় লেগে যায়। তাছাড়া বস্তিতে কোনো সিসি ক্যামেরাও থাকে না, যাতে ফুটেজ দেখে অপরাধীদের শনাক্ত করা যায়।

দোষীদের শাস্তি না হওয়ায় নিয়মিতই ঘটছে বস্তিতে অগ্নিকাণ্ড। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, গত পাঁচ বছরে শুধু রাজধানীর বস্তিগুলোতেই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ১৭৮টি। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ১৭ জন।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে ঢাকার বিভিন্ন বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে ২৯টি। এতে ক্ষয়ক্ষতি হয় ৭ কোটি ৬৫ লাখ টাকার। পরের বছর অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৩-এ। ১২ জনের প্রাণহানির পাশাপাশি এতে ক্ষতি হয় ১ কোটি ৭৯ লাখ টাকার। ২০১৫ সালে রাজধানীর বস্তিগুলোয় অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা আরো বেড়ে যায়। ওই বছর ৪৭টি অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয় তিনজন আর ক্ষয়ক্ষতি হয় ১ কোটি ১১ লাখ টাকার। পরের বছর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা কিছুটা কমে দাঁড়ায় ২৭টিতে। এতে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি নিহত হয় একজন। সর্বশেষ ২০১৭ সালে রাজধানীর বস্তিগুলোয় ৩২টি অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারায় একজন। পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকায়।

এসব অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহম্মেদ খান এই প্রতিবেদককে বলেন, বেশির ভাগ বস্তিতেই অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়। অবৈধ এসব সংযোগের সরঞ্জামও থাকে নিম্নমানের। তাই শর্ট সার্কিট থেকেই বেশির ভাগ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। বস্তিতে অবৈধ গ্যাস সংযোগ নিয়ে চুলা ব্যবহারের কারণেও অগ্নিকাণ্ড ঘটে। তবে দুই পক্ষের শত্রুতা ও দখল-পুনর্দখলের বিষয়টিকেও উড়িয়ে দেয়া যায় না।

বিদ্যুতের লাইন নিয়ে কুর্মিটোলা ক্যাম্প (বিহারী বস্তি) ও রাজু বস্তির মধ্যে বিতণ্ডা হতো প্রায়ই। এর মধ্যেই ২০১৪ সালে ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটে। আগুনে পুড়ে প্রাণ হারায় ক্যাম্পের ১০ জন। ওই ঘটনায় মামলা হলে তিন বছরেও অভিযোগপত্র দেয়া হয়নি।

গতকাল কালশীতে কথা হয় অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকজনের সঙ্গে। জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মাদ আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ঘটনার তিন বছরেও বিচার পেলাম না। আগুন কারা লাগালো তাও জানতে পারলাম না।

রাজধানীর গুলশান ও বনানী এলাকার সীমারেখায় অবস্থান কড়াইল বস্তির। ওই বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা প্রায় নিয়মিত। সর্বশেষ গত বছরের ১৬ মার্চ গভীর রাতে বস্তিটিতে আগুন লাগে। কেরোসিনের চুলা থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হলেও এর পেছনে কারা তা জানা যায়নি। একইভাবে অনুদ্ঘাটিত রয়ে গেছে বস্তিটিতে সংঘটিত আগের অগ্নিকাণ্ডগুলোর মূল হোতারাও।

কড়াইল বস্তির অগ্নিকাণ্ড নিয়ে কথা হয় বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিএম ফরমান আলীর সঙ্গে। এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, কড়াইল বস্তির অগ্নিকাণ্ডগুলো দুর্ঘটনাবশত। এ কারণেই কেউ কখনো মামলা করেনি। আর মামলা না হলে দায়ী কারা তা জানা সম্ভব হয় না।

১২ মার্চ রাজধানীর মিরপুরে ইলিয়াস মোল্লা বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যায় চার হাজারের বেশি ঘর। বস্তির উত্তর অংশে আগুনের সূত্রপাত হলেও দ্রুত তা দক্ষিণ অংশে ছড়িয়ে পড়ে। আতঙ্কিত লোকজন প্রাণ নিয়ে বেরোতে পারলেও ভস্মীভূত হয়েছে তাদের সর্বস্ব। এর পেছনে অন্য কারণ থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বস্তির বিভিন্ন দুর্যোগ নিয়ে কাজ করে কোয়ালিশন ফর দি আরবান পুওর (সিইউপি) নামের একটি বেসরকারি সংস্থা। এর নির্বাহী পরিচালক খন্দকার রেবেকা সুন্নত বলেন, আগুনের খবর পেয়ে আমরাও ঘটনাস্থলে যাই। কিন্তু আগুনের ধরন দেখে মনে হয়নি, এটি নিছক দুর্ঘটনা। এ আগুনের পেছনে দুটি কারণ থাকতে পারে। এর একটি হলো বস্তির জমি ফাঁকা করে তা পুনর্দখল।

বস্তির সংখ্যা ঢাকায় বেশি হলেও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা চট্টগ্রামে বেশি। ২০১৩-১৭ সালে এখানকার বস্তিগুলোয় আগুন লেগেছে মোট ৮৭২ বার। এসব অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানি না ঘটলেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৫ কোটি টাকার। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বন্দরনগরীর বিভিন্ন বস্তিতে সবচেয়ে বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে ২০১৪ সালে, ৫৬৮টি। এসব অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতি হয় ২১ কোটি টাকার। নগরীর বস্তিতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অগ্নিকাণ্ড হয় গত বছর, ১৫৩টি। এতে ক্ষতির পরিমাণ ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকার। ২০১৬ সালে ১২৬টি অগ্নিকাণ্ডে প্রায় সোয়া ২ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। এছাড়া ২০১৫ সালে চট্টগ্রামের বিভিন্ন বস্তিতে ২৫টি অগ্নিকাণ্ডে আর্থিক ক্ষতি হয় অর্ধকোটি টাকা। ২০১৩ সালে চট্টগ্রামের বস্তিগুলোয় ২০টি অগ্নিকাণ্ড ঘটলেও ক্ষয়ক্ষতির কোনো তথ্য নেই ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের কাছে।

চট্টগ্রামের তুলাতলী বস্তিটিতেইে আগুন লেগেছে এ পর্যন্ত চারবার। সর্বশেষ ২০১৩ সালে অগ্নিকাণ্ডে ভস্মীভূত হয় বস্তির ৬০টি ঘর। প্রতিবারই চুলার আগুন, সিগারেটের আগুন ও বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটকে দায়ী করে তদন্ত শেষ করেছে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ।

যদিও ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের এ ভাষ্যের সঙ্গে একমত নয় বস্তির বাসিন্দারা। ৩০ বছর ধরে তুলাতলী বস্তিতে বসবাস করে আসা হিরণ মিয়ার দাবি, আধিপত্য বিস্তার ও বসতঘরের নতুন মালিকানা পেতেই এসব আগুন। সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের কিছু ক্ষতিপূরণ দেয়া হয় বটে, তবে বদলে যায় মালিকানা। ২০১৩ সালের অগ্নিকাণ্ডও নিছক দুর্ঘটনা নয়, আধিপত্য বিস্তারের কৌশল।

চট্টগ্রামের সদরঘাট থানাধীন মাইল্লার বিল বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে ২০১৭ সালের শুরুর দিকে। ৫৫০টি বসতঘরের ওই বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডে সাড়ে ৩০০ ঘর পুড়ে যায়। ওই ঘটনার পর ব্যক্তিমালিকানাধীন বস্তিতে একটি বৃহৎ গুদাম তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ইজারার মাধ্যমে পাওয়া জমিটির বস্তিবাসীকে উচ্ছেদ করতেই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের। যদিও ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লেগেছে বলে প্রাথমিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। অগ্নিকান্ডের পর থানায় কোনো মামলা না হওয়ায় তদন্ত হয়নি। ফলে কারো বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রও দেয়া যায়নি।

চট্টগ্রামের বন্দর, ডবলমুরিং, সদরঘাট, ইপিজেড এলাকার বিভিন্ন বস্তি সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, বিভিন্ন সময় স্থানীয় প্রভাবশালীরা দখল কিংবা ইজারা নেয়া জমিতে ঘর তুলে বস্তি তৈরি করে। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ এলাকায় একসময় ১৫-২০টি বস্তি থাকলেও বর্তমানে সে সংখ্যা ৫-এ নেমে এসেছে। আগ্রাবাদ কমার্শিয়াল এলাকায় অফিস ভাড়ার চাহিদা বেশি থাকায় বিভিন্ন সময় অগ্নিকাণ্ডের পর বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয় এসব স্থানে।

নগরীর সিআরবি এলাকায় বস্তিবাসীর একটি সংগঠনের নেতা মো. শুক্কুর এই প্রতিবেদককে বলেন, বস্তিতে আগুন লাগলে কয়েকদিন মিডিয়ায় আলোচনা হয়, পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা আসেন। এরপর কয়েকদিন ফ্রি খাবার প্রদান করা হলেও নিজ উদ্যোগে আবারো ঘর নির্মাণ করে বাস্তুহারা মানুষ। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি হলেও মামলা দায়ের হয় কিনা, সে বিষয়ে কিছু জানেন না তিনি।

সাধারণত বস্তির অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হয় না বলে জানান চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) মো. জাহাঙ্গীর আলম। এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, হতাহতের ঘটনা ঘটলে কেউ বাদী না হলেও পুলিশ অপমৃত্যুর মামলা দায়েরের পর সার্কেল অফিসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করে। কেউ নাশকতা বা অন্য কোনো অভিযোগে মামলা করলে পুলিশ তদন্তের ব্যবস্থা নেয়। তবে এখন পর্যন্ত বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের পেছনে নাশকতার কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও রংপুরের বস্তিগুলোয় গত পাঁচ বছরে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে ১৪৬টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আগুনের ঘটনা রংপুরের বিভিন্ন বস্তিতে, ৬৭টি। এরপর সর্বোচ্চসংখ্যক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে রাজশাহীতে ৪১টি, সিলেটে ২৩টি, খুলনায় ১৩টি ও বরিশালে তিনটি।

বিবিএসের সর্বশেষ বস্তিশুমারি ২০১৪ অনুযায়ী, সারা দেশে বস্তি রয়েছে ১৩ হাজার ৯৩৫টি। এর মধ্যে সিটি করপোরেশন এলাকায় বস্তির সংখ্যা ৯ হাজার ১১৩। সিটি করপোরেশন এলাকার বস্তিগুলোর মধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে রয়েছে ৩ হাজার ৩৯৪টি। চট্টগ্রামে এ সংখ্যা ২ হাজার ২১৬।

এসব বস্তিবাসীর অধিকাংশই কোনো না কোনোভাবে নগর অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছেন। এসব বস্তির বাসিন্দাদের ১৩ দশমিক ১৮ শতাংশ পোশাক শ্রমিক হিসেবে কর্মরত। ৬ দশমিক ৯২ শতাংশ রিলগা/ভ্যান চালনা ও ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ ছোট ব্যবসা পরিচালনা করেন। ৬ দশমিক ৪১ শতাংশ গৃহপরিচারিকা, ৫ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ দিনমজুর ও ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করেন।

তথ্য:

বিভাগ:

প্রকাশ: মার্চ ২০, ২০১৮

সর্বমোট পড়েছেন: 433 জন

মন্তব্য: 0 টি

সূত্র: বণিক বার্তা

সংশ্লিষ্ট সংবাদ