আরো একবার স্বপ্ন জাগিয়ে স্বপ্নভঙ্গ

স্পোর্টস ডেস্ক : মার্চ ১৮, ২০১৮

আবারো স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় পুড়ল বাংলাদেশ দল। ট্রফি ছোঁয়া দূরত্বে গিয়েও আবারো ফিরতে হলো খালি হাতে। ‘ক্লাইম্যাক্স’, ‘অ্যান্টিক্লাইম্যাক্সে’ ভরা ম্যাচে শেষ বলের ছক্কায় বাংলাদেশকে ৪ উইকেটে হারিয়ে নিদাহাস ট্রফির শিরোপা জিতল ভারত। 

অথচ অধরা শিরোপাটা প্রায় বাংলাদেশের হাতে ধরা দিচ্ছিল। কী দুর্দান্ত একটা ওভারই না করলেন মুস্তাফিজুর রহমান। ভারতের দরকার ১৮ বলে ৩৫ রান। ১৮তম ওভারটা মুস্তাফিজ নিলেন উইকেট মেডেন! লেগ বাই থেকে যদিও ১ রান এসেছিল। তারপরও তো শেষ ১২ বলে ভারতের দরকার ৩৪ রান। কঠিন তো অবশ্যই। জয়টা তখন বাংলাদেশের হাতের মুঠোয়। বাংলাদেশের সমর্থকদের হৃদয়ে একটা মৃদু উৎসবও শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু সেই উৎসব যে খানিক বাদেই বিষাদে পরিণত হবে, তা কে জানত! 

ডেথ ওভারে বাংলাদেশের সবচেয়ে কার্যকরী বোলার তিনি। সেই রুবেল হোসেন ১৯তম ওভারে ২২ রান দেবেন, সেটা কি কেউ ভেবেছিল? নতুন ব্যাটসম্যান হিসেবে কেবলই উইকেটে এসেছেন। দিনেশ কার্তিকের মাথায় তখন রাজ্যের চাপ। সেই কার্তিক কিনা রুবেলের প্রথম তিন বলেই দুটি ছক্কার সঙ্গে হাঁকালেন একটি চার। পরের দুই বলে এলো দুই রান। শেষ বলে আবার কার্তিকের চার। বাংলাদেশও ম্যাচ থেকে দূরে সরে গেল খানিকটা।

মেহেদী হাসান মিরাজ এক ওভারে ১৭ রান দেওয়ায় তাকে পরে আর বলই দেননি অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। মাঝে সৌম্য সরকারকে দিয়ে করিয়ে নেন দুই ওভার। সেই সৌম্যর হাতে শেষ ওভারে বল তুলে দিলেন অধিনায়ক। পার্ট-টাইম বোলারের হাতে শেষ ওভারে ১২ রান আটকানোর দায়িত্ব!

সৌম্যর শুরুটা হলো ওয়াইড দিয়ে। প্রথম তিন বলে যদিও ২ রানের বেশি নিতে দিলেন না দুই ব্যাটসম্যানকে। চতুর্থ বলে থার্ডম্যান দিয়ে বিজয় শঙ্করের চার। ২ বলে প্রয়োজন ৫ রান। ছক্কায় ম্যাচ শেষ করতে চেয়েছিলেন শঙ্কর। কিন্তু বল উঠে গেল আকাশে। ক্যাচ ধরতে গেলেন দুই ফিল্ডার। একজনের হাত থেকে ছুটে গেলেও দুবারের চেষ্টায় বল তালুবন্দি করলেন মিরাজ।

শেষ বলে চাই ৫। শুধু বাউন্ডারি হলেও ম্যাচ গড়াবে সুপার ওভারে। সৌম্য বলটা দিলেন অফ স্টাম্পের একটু বাইরে। কার্তিক বল হাওয়ায় ভাসালেন। ক্যাচ, ছক্কা নাকি চার- এই ভেবে উত্তেজনায় কাঁপছে টিভি সেটের সামনে থাকা দর্শকরা। কার্তিকের শটটা কভারের ওপর দিয়ে আছড়ে পড়ল সীমানা দড়ির একটু পরেই। সঙ্গে সঙ্গে বুনো উল্লাসে ড্রেসিং রুম থেকে বেরিয়ে এলো ভারতের খেলোয়াড়, টিম ম্যানেজমেন্টের সদস্যরা। ওদিকে স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় নুইয়ে পড়েছে বাংলাদেশের  খেলোয়াড়রা। কে কাকে সান্ত্বনা দেবেন!

আগের চার ফাইনালই বাংলাদেশ খেলেছিল দেশের মাটিতে, ঢাকায়। এর একটিতে হেরেছিল এই ভারতের কাছেই। এবারই প্রথম বিদেশের মাটিতে কোনো ফাইনালে ওঠে বাংলাদেশ। কিন্তু কলম্বোর আর প্রেমাদাসাও বাংলাদেশকে হতাশ করল। ২০০৯ ত্রিদেশীয় সিরিজ, ২০১২ এশিয়া কাপ, ২০১৬ এশিয়া কাপ, ২০১৮ ত্রিদেশীয় সিরিজের পর শ্রীলঙ্কায় ত্রিদেশীয় সিরিজ নিদাহাস ট্রফি- বাংলাদেশের হতাশার স্মৃতিতে যোগ হলো আরেকটি অধ্যায়।

টানা তিন ম্যাচে টস জেতা বাংলাদেশ ফাইনালে টস-ভাগ্যকে আর পাশে পায়নি। রোববার টস জিতে বাংলাদেশকে ব্যাটিংয়ে পাঠান ভারত অধিনায়ক রোহিত শর্মা। তামিম ইকবাল ও লিটন দাসের ব্যাটিং ভালো শুরুরই ইঙ্গিত দিচ্ছিল। প্রথম ওভারে ৯ রান তোলা বাংলাদেশের তিন ওভার শেষে সংগ্রহ বিনা উইকেটে ২৬। তৃতীয় ওভারে পেসার জয়দেব উনাডকটকে পয়েন্টের ওপর দিয়ে আছড়ে ফেলেছিলেন লিটন। 

কিন্তু ১১ বলের একটা ঝড়ে হঠাৎ এলোমেলো হয়ে যায় বাংলাদেশের ব্যাটিং। হতাশার শুরুটা লিটনকে দিয়ে। অফ স্পিনার ওয়াশিংটন সুন্দরকে স্লগ সুইপ করতে গিয়েছিলেন লিটন। টপ-এজ হয়ে বল উঠে যায় আকাশে (৯ বলে ১১)।

পরের ওভারে প্রথমবারের মতো আক্রমণে আসা লেগ স্পিনার যুজবেন্দ্র চাহালকে লং-অনের ওপর দিয়ে ওড়াতে চেয়েছিলেন তামিম। সীমানা দড়ির কাছে দুই হাত ওপরে তুলে টুর্নামেন্টেরই অন্যতম সেরা এক ক্যাচ নেন শার্দুল ঠাকুর (১৩ বলে ১৫)।

পুরো টুর্নামেন্টে ব্যর্থ সৌম্য সরকার শেষ সুযোগটাও কাজে লাগাতে পারেননি। তার গল্পটা অনেকটা এরকম- এলেন আর গেলেন! মুখোমুখি প্রথম বলেই চাহালকে সুইপ করতে গিয়ে শিখর ধাওয়ানকে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। বিনা উইকেটে ২৭ থেকে বাংলাদেশের স্কোর তখন ৩ উইকেটে ৩৩!

এরপর বাংলাদেশকে টেনে তোলার দায়িত্বটা নিজের কাঁধে নেন সাব্বির রহমান। প্রথমে পঞ্চম উইকেটে মুশফিকুর রহিমকে সঙ্গে নিয়ে ৩৫ রানের জুটিতে বিপর্যয় সামাল দেন। চাহালের গুগলি না বুঝেই উড়াতে চেয়েছিলেন মুশফিক। দুর্দান্ত এক ক্যাচ নেন বিজয় শঙ্কর। মুশফিক ফেরেন ৯ রান করে। 

ষষ্ঠ উইকেটে মাহমুদউল্লাহর সঙ্গে সাব্বির গড়েন ৩৬ রানের আরেকটি কার্যকরী জুটি। দুজন খেলছিলেন দারুণ। কিন্তু ভুল বোঝাবুঝিতে রান আউটে কাটা পড়েন মাহমুদউল্লাহ। বিজয় শঙ্করের স্লোয়ার বল ঠিকমতো খেলতে পারেননি মাহমুদউল্লাহ। বল চলে যায় উইকেটের পেছনে। মাহমুদউল্লাহ তাকিয়ে ছিলেন সেদিকেই। নন স্ট্রাইকে থাকা সাব্বির ততক্ষণে ছুটে যান তার প্রান্তে।  উইকেটরক্ষক দিনেশ কার্তিক বল ছুড়েন বোলার শঙ্করের দিকে। প্রথমে ঠিকমতো ধরতে না পারলেও বল কুড়িয়ে দৌড়ে গিয়ে স্টাম্প ভেঙে দেন শঙ্কর। 

পরের ওভারে সাব্বির তুলে নেন ফিফটি। অফ স্পিনার ওয়াশিংটন সুন্দরকে লং অন দিয়ে ছক্কা হাঁকিয়ে ৪৩ থেকে পৌঁছে যান ৪৯-এ। পরের বলটা লং অফে ঠেলে ২১ আন্তর্জাতিক ইনিংস পর পান ফিফটি। টি-টোয়েন্টিতে চতুর্থ ফিফটি। পরের ওভারে শঙ্করকে তিন বলের মধ্যে হাঁকান দুটি ছক্কা।

অধিনায়ক সাকিব বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। রান আউট হয়ে ফেরেন ৭ রান করে। ১৯তম ওভারে জয়দেব উনাডকটের পরপর দুই বলে ফেরেন সাব্বির ও রুবেল হোসেন। দুজনই বোল্ড। সাব্বির ৫০ বলে ৭ চার ও ৪ ছক্কায় খেলেন ৭৭ রানের ঝোড়ো ইনিংস। কোনো টি-টোয়েন্টি ফাইনালে এটি যৌথভাবে চতুর্থ সর্বোচ্চ ইনিংস। ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মারলন স্যামুয়েলসের অপরাজিত ৮৫ রান সর্বোচ্চ।

শেষ ওভারে দুই চার ও এক ছক্কায় মেহেদী হাসান মিরাজের তোলা ১৮ রানে বাংলাদেশ পায় ১৬৬ রানের পুঁজি। ৭ বলে ১৯ রানের ছোট্ট ঝোড়ো ইনিংস খেলেন মিরাজ। শুরুতে ১৮ রানে ৩ উইকেট নেওয়া চাহালই ভারতের সেরা বোলার।

জিততে হলে বোলিংয়ে প্রয়োজন ছিল দারুণ শুরু। সাকিবের করা প্রথম ওভারে ৭ রান এলেও পরের ওভারে ভারত তোলে ১৭ রান। মিরাজের তিন বলে রোহিত শর্মা হাঁকান দুই ছক্কা, এক চার। তৃতীয় ওভারে সাকিবের প্রথম বলে ছক্কা হাঁকিয়েছিলেন শিখর ধাওয়ান। দুই বল পরই বাঁহাতি ব্যাটসম্যানকে ফিরিয়ে উদ্বোধনী জুটি ভাঙেন বাঁহাতি স্পিনার। দারুণ ক্যাচ নেন বদলি ফিল্ডার আরিফুল হক।

ভারত সেই ধাক্কা সামলে উঠতে না উঠতেই পরের ওভারে আঘাত হানেন রুবেল। ডানহাতি পেসারের বল ওয়াইড দিয়েছিলেন আম্পায়ার। মুশফিক বল ধরেই আবেদন করেন কট বিহাইন্ডের। সাকিব নেন রিভিউ। রিপ্লেতে দেখা যায়, বল মুশফিকের হাতে যাওয়ার আগে রায়নার ব্যাট ছুঁয়েছিল। ভারতের স্কোর ২৭ রানে রেখে দুই উইকেট তুলে নেয় বাংলাদেশ।

আগের দিন মাশরাফি বিন মুর্তজা বলেছিলেন, ম্যাচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে দ্রুতই ফেরাতে হবে রোহিত ও ধাওয়ানকে। ধাওয়ানকে শুরুতে ফেরানো গেলেও আরেক ওপেনারকে ফেরানো যায়নি। আগের ম্যাচে বাংলাদেশের বিপক্ষে ৮৯ রান করে ছন্দে ফিরেছিলেন। পরের ম্যাচেও বাংলাদেশের বোলারদের ভোগান রোহিত। তুলে নেন টানা দ্বিতীয় ফিফটি।

রোহিতের ফিফটির আগেই লোকেশ রাহুলকে ফিরিয়ে ৫১ রানের জুটি ভাঙেন রুবেল। বাউন্সার পুল করতে গিয়ে বাউন্ডারিতে সাব্বিরের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন রাহুল (২৪)। ৯ থেকে ১২- এই তিন ওভারে বেশ নিয়ন্ত্রিত বোলিংই করেছে বাংলাদেশ। এই সময়ে ভারত তুলতে পারে মাত্র ১৬ রান। 

তাতে শেষ ৭ ওভারে ভারতের আস্কিং রান রেট উঠে যায় ১০-এ। টুর্নামেন্টে আগের চার ম্যাচের তিনটিতে বোলিং করে কোনো উইকেট পাননি নাজমুল ইসলাম অপু। নিজের শেষ ওভার করতে এসে সবচেয়ে বড় উইকেটটাই নেন বাঁহাতি এই স্পিনার। ১৪তম ওভারে অপুকে উড়াতে গিয়ে লং লনে মাহমুদউল্লাহকে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন ভারত অধিনায়ক (৪২ বলে ৫৬)।

শেষ ৫ ওভারে ভারতের প্রয়োজন ছিল ৫২। যেটি শেষ ৩ ওভারে দাঁড়ায় ৩৫ রানে। অবিশ্বাস্য এক ওভার করে জয়টা প্রায় বাংলাদেশের হাতের মুঠোয় এনেছিলেন মুস্তাফিজ। তখনো কে জানত, জয়টা শেষ পর্যন্ত হাতের মুঠো থেকে ফসকে যাবে!

সংক্ষিপ্ত স্কোর

 বাংলাদেশ ইনিংস: ১৬৬/৮ (২০ ওভার)

(তামিম ইকবাল ১৫, লিটন দাস ১১, সাব্বির রহমান ৭৭, সৌম্য সরকার ১, মুশফিকুর রহিম ৯, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ২১, সাকিব আল হাসান ৭, মেহেদী হাসান মিরাজ ১৯*, রুবেল হোসেন ০, মোস্তাফিজুর রহমান ০*; জয়দেব উনাদকাত ২/৩৩, ওয়াশিংটন সুন্দর ১/২০, যুজবেন্দ্র চাহাল ৩/১৮, শারদুল ঠাকুর ০/৪৫, বিজয় শঙ্কর ০/৪৮)।

ভারত ইনিংস:

(রোহিত শর্মা ৫৬, শিখর ধাওয়ান ১০, সুরেশ রায়না ০, লোকেশ রাহুল ২৪, মনিশ পান্ডে ২৮, বিজয় শঙ্কর, দিনেশ কার্তিক; সাকিব আল হাসান ১/২৮, মেহেদী হাসান মিরাজ ০/১৭, রুবেল হোসেন ২/২৫, নাজমুল ইসলাম অপু ১/৩২, মোস্তাফিজুর রহমান ১/২১, সৌম্য সরকার)।

তথ্য:

বিভাগ:

প্রকাশ: মার্চ ১৮, ২০১৮

প্রতিবেদক:

সর্বমোট পড়েছেন: 198 জন

মন্তব্য: 0 টি

বিজ্ঞাপন জন্য স্থান
(আপনার বিজ্ঞাপনের জন্য আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন)