'ওরা মানুষ না, ওরা খাইতে দিত না'

প্রবাস ডেস্ক : মার্চ ১৪, ২০১৮

'মনে করছিলাম সৌদি আরবে যাচ্ছি। বছর দুয়েক কাজ করে কিছু টাকা-পয়সা লয়ে (নিয়ে) হজ্জ করে তয় দেশে ফিরবো। কিন্তু ওদেশের কফিলরা (বাড়ীর মালিক) মানুষ না, খুব নির্যাতন করতো। খাইতে দিত না, হুমকি-ধামকি দিত, মারধর করতো। ভয়ে হাসিনার (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) অ্যাম্বাসিতে গেছিলাম। তারা দেশে পাঠাই দিছে।'

এভাবেই কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিলেন সৌদি আরবে গৃহকর্মীর কাজে যেয়ে নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসা নারায়ণগঞ্জের ৪৩ বছর বয়সী এক নারী।

কথা বলে জানা যায়, ওই নারীর তিন সন্তানের এক সন্তান হারিয়ে গেছে। দুই সন্তান রিকশাচালায় আর স্বামী দেড় বছর আগে মারা গেছেন। তাই নিজেই রোজগার করতে গিয়েছিল সৌদি আরবে।

তিনি পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, 'আমি প্রায় সাত মাস আগে গেছিলাম দালালের মাধ্যমে সৌদিতে। যে বাড়িতে কাজ ঠিক করে দিছিল দালাল। সেখানে আমার মত আরো ৯ জন কাজ করতো। আমাদের দিয়ে সব কাজ করিয়ে নিত, কিন্তু টাকা দিতে চাইতো না। বাড়িতে কথা বলতে দিত না। কথায় কথায় মারধর করতো। মারধর করায় পাগলও হয়ে গেছে একজন। আবার কিছু বললে কেস (মামলা) দিয়ে দিতো।'

তিনি বলেন, 'আমি সাত মাস কাজ করলেও মাত্র দুই মাসের টাকা পেয়েছি। টাকা চাইলে দিত না। সাত মাসে তিন জায়গায় কাজ করেছি, সবাই শুধু মারধর করেছে। টাকা দিতে চাইতো না।'

তিনি এসময় বলেন, 'তওবা করছি। দেশে না খেয়ে মরবো, তায় সৌদিতে আর যাবো না।'

নারায়ণগঞ্জের এই নারীর মত গৃহকর্মীর কাজ করতে যেয়ে নির্যাতনেরর শিকার রোববার রাতে ইত্তেহাদ বিমানে ৩৯ জন সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশ অ্যাম্বাসির মাধ্যমে দেশে ফিরেছেন। এদের মধ্যে সৌদির ইমিগ্রেশন ক্যাম্প (সফর জেল) থেকে ৩৬ জন নারী এসেছে।

সৌদি আরবে নির্যাতন শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসা নারীদের অধিকাংশের সাথেই কথা বলে জানা যায়, নির্মম নির্যাতনের কথা। তবে কষ্ট থাকলে অবশেষে নিজ ভূমিতে এসে নিশ্বাস নিতে পেরে সবাই সবাই খুশি।

তারা বলেন, 'কষ্ট করলে দেশেই করবো, কিন্তু পরদেশে টাকার লোভে আর নির্যাতনের শিকার হতে রাজি নই।'

হবিগঞ্জের দুই বোন গিয়েছিল সৌদি আরবে গৃহকর্মীর কাজ করতে। এক বোন দুই মাস ও অন্য বোন ৫ মাস ছিল। ৫ মাস যে ছিল-সে তিন মাস গৃহকর্মীর কাজ করেছে ও দুই মাস ছিল ইমিগ্রেশন জেলে। তিনি জানালেন, 'ওরা ভালো মানুষ না। ওরা খুব খারাপ।'

একইভাবে ফিরে আসা নরসিংদীর পুঠিয়ার ৪৫ বছর বয়সী নারী বলেন, 'কফিল (বাড়ির মালিকরা) আমাদেরকে বাড়িতে কথা বলতে দিত না। একদিন বাড়িতে কথা বলতে চাওয়ায় আমায় গলায় পা দিয়ে চেপে ধরে ও রড দিয়ে আঘাত করে। বাথরুমে আটকে রাখতো। খাইতে দিত না। খুব কষ্ট দিছে।' তিনি বলেন, 'আল্লাহ্ আমাকে বাঁচাইছে, দেশে ফিরতে পারছি।'

একইভাবে ছোট দুই সন্তানকে রেখে সংসারের হাল ধরতে নারায়ণগঞ্জ আড়াইহাজারের ৩৫ বছরের নারী গৃহকর্মীর কাজে গিয়েছিলেন। স্বপ্ন ছিল সৌদি রিয়াল অর্জন করে সংসারে শান্তি ফিরিয়ে আনবে। অথচ মাস দুয়েক কাজের পরেই নির্যাতন অতিষ্ঠ হয়ে চলে আসেন অ্যাম্বাসিতে। পরে সেখান থেকে ইমিগ্রেশন ক্যাম্পে (সফর জেল) হয়ে দেশে ফিরেছে। এয়ারপোর্টে এসে পৌঁছেছে। কিন্তু স্বামীকে ফোন দিতে পারছে না লজ্জায়। কারণ স্বপ্ন ধূলিস্যাৎ হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, 'আমার স্বামী গরীব মানুষ। অনেক কষ্টে টাকাগুলো দিছিল (দিয়েছেন) যাওয়ার সময়। এখন টাকাও শেষ, আর আমি খালি হাতে ফিরে এসেছি। আসলে গরীবের টাকার স্বপ্ন দেখতে নেই।'

এদিকে প্রতিনিয়ত সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্য দেশে যেয়ে বাংলাদেশী নারীরা নির্যাতন শিকার হচ্ছে। তাদেরকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ অনার্স কল্যাণ বোর্ড কাজ করছে বলে জানা গেছে। আর ব্র্যাক তাদেরকে সহযোগিতা করছে।

এব্যাপারে ব্র্যাকের তথ্য কর্মকর্তা ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের আল আমিন নয়ন বলেন, 'ব্র্যাকের পক্ষ থেকে আমরা সহযোগিতা করে থাকি।'

 

তথ্য:

বিভাগ:

প্রকাশ: মার্চ ১৪, ২০১৮

প্রতিবেদক:

সর্বমোট পড়েছেন: 613 জন

মন্তব্য: 0 টি

সূত্র: সূত্রঃ পরিবর্তন ডট কম।