কী অপরাধ ছিল বিউটির?

প্রবাসীর দিগন্ত | প্রবাসীরদিগন্ত ডেস্ক : মার্চ ২৭, ২০১৮

একটা ভিডিও দেখছিলাম টাইমস অফ ইন্ডিয়ার ফেসবুক পেইজে। ভারতের ভোপালে চারজন মিলে একটা মেয়েকে গণধর্ষণ করেছে। পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছে তারা। শহরের রাস্তা দিয়ে ওদেরকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ, আর লোকজন, বিশেষ করে নারীরা এসে চড় থাপ্পড় দিয়ে যাচ্ছে সেই চারজনকে। কেউ জুতা খুলে মারছে, সমানে গালমন্দ করে চলেছে। ঘৃণ্য এই অপরাধের প্রাথমিক সাজা হিসেবেই এদেরকে নিয়ে পুরো শহরে চক্কর দিয়েছে পুলিশ, মানুষকে দেখিয়েছে, এরা নরপশু, এদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
লাল রঙের পোষাক পরিহিতা এক ভদ্রমহিলাকে দেখা গেল ভীষণ উত্তেজিত অবস্থায়। সমানে চড় মেরে চলেছেন এই চারজনকে, পালা করে। যেন বাদ যাবে না একটি গালও। মনের ভেতরে পুঞ্জিভূত ক্ষোভ আর ঘৃণা দুই হাতে এক করে উগরে দিচ্ছেন এই চার ধর্ষকের ওপরে। একজন মহিলা পুলিশ কোত্থেকে যেন একপাটি জুতা নিয়ে এলেন, সেই জুতা দিয়েই মারলেন এদেরকে। এক তরুণী তো আরেকটু বেশি সাহস দেখিয়ে একদম কলার চেপে ধরেই মারলেন এদের একজনকে। পুলিশের লোকজন নিজেরাই নারীদের ডেকে আনছেন এদের মারার জন্যে। কানে ধরে সবাইকে উঠবস করানো হলো কয়েক দফা। বাকীটা আদালতের দায়িত্ব, সাক্ষ্য-প্রমাণ শেষে এদেরকে নিশ্চয়ই প্রাপ্য শাস্তিটা দেয়া হবে। কিন্ত তার আগে, শহরের মানুষের কাছ থেকে সেই শাস্তির খুব ছোট একটা স্যাম্পল তাদেরকে দিয়ে দিলো স্থানীয় পুলিশ।
ভারতের কথা থাকুক, নিজের দেশে আসি। স্বাধীনতা দিবসে ফেসবুকের নিউজ ফিডটা লাল সবুজে ঢেকে থাকার কথা ছিল। তার বদলে সেই জায়গাটা দখল করে নিলো একটা ছবি। একটা মেয়ে পড়ে আছে সবুজ ঘাসে ঢাকা মাটির ওপরে, যেন বাংলাদেশের পতাকায় সবুজ জমিনে শুয়ে আছে একটা লাল বৃত্ত। ছবিটার সত্যতা জানি না, তবে সঙ্গে যে খবরটা পড়লাম, সেটা সত্যি। আর সেই সত্যিটা ভীষণ হৃদয়বিদারক।
নিউটি, ধর্ষন, মামলা
ঘটনার শুরুটা আজ থেকে দুই মাস আগে। বিউটি আক্তার নামের ষোল বছরের এক কিশোরীকে অপহরণ করে ধর্ষণ করেছিল স্থানীয় প্রভাবশালীরা, পুলিশ আর স্থানীয় সংবাদমাধ্যম যাদেরকে ‘দুর্বৃত্ত’ নামে আখ্যা দিয়েছে। হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে বিউটিদের বাড়ি। এই ঘটনায় বিউটির বাবা সায়েদ আলী স্থানীয় মহিলা মেম্বার আর তার ছেলেকে আসামী করে আদালতে মামলা করেছিলেন। আদালতের নির্দেশে পুলিশ মামলাটি এফআইআরভুক্ত করে, তারপর নিয়ম মেনে ডাক্তারী পরীক্ষাও সম্পন্ন হয়।
অভিযুক্তরা এলাকায় দাপটের সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছিল দিনে দুপুরে, অথচ পুলিশ বলছে তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ ওরা প্রভাবশালী, স্থানীয় আইন কানুন তারা পকেটে ঢুকিয়ে চলাফেরা করে। মামলা তুলে নেয়ার জন্যে বিউটির পরিবারকে হুমকি দেয়া হচ্ছিল ক্রমাগত। নিরাপত্তার জন্যেই বিউটিকে তার নানার বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল কিছুদিন আগে। তাতেও অবশ্য হুমকি বন্ধ হয়নি।
গত শনিবার ভোর থেকে বিউটিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ উপজেলার পুরাইকলা বাজারের পাশে একটি হাওড়ে একটা মেয়ের লাশ পড়ে থাকতে দেখে পুলিশে খবর দেয় স্থানীয় লোকজন। পুলিশ এসে বিউটির মৃতদেহ সনাক্ত করে। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে ছিল বিউটির শরীর। ধারণা করা হচ্ছে, তাকে তুলে নিয়ে ধর্ষণের পরে হত্যা করা হয়েছে। আসামীরা এবার আর মামলা হামলার ঝামেলায় যেতে চায়নি, তাই কিশোরি মেয়েটাকে চিরতরে শেষ করে দিয়েছে।
এরকম ঘটনাগুলো শুনলে মনে হয়, কোন অরাজকতার দেশে বসবাস করছি আমরা! একটা মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়েছে, তার পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছিল অপরাধীদের বিচার চেয়ে। সেই মামলা উঠিয়ে নেয়ার জন্যে কত হুমকি দেয়া হলো। শেষমেশ সেই অসহায় মেয়েটাকে আবার তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণের পরে খুন করলো ওরা। সিনেমার গল্পও এত ভয়ঙ্কর হয় না। কিংবা হলেও, সিনেমায়ত একজন নায়ক থাকে। বাস্তবের এই গল্পে শুধু ভিলেনরাই আছে, নায়কের অস্তিত্ব নেই কোথাও।
আমাদের দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই ধর্ষণের এইও মহামারী শুরু হয়েছে। ধর্ষণ করেও প্রভাবশালীরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। কেউ মুখ খুললে, বা মামলা করলে তার পরিণতি হয় বিউটির মতো। দিনকে দিন অদ্ভুত এক অরাজকতার রাজ্যে পরিণত হচ্ছে দেশটা, অথচ যারা আইনপ্রণেতা, তাদের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই এদিকে। ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যেখানে মৃত্যুদণ্ড হওয়া দরকার, সেখানে সেটাকে করা হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড! পনেরো বিশ বছর আগে ধর্ষণের শিকার হওয়া মানুষগুলো বা তাদের পরিবারের সদস্যেরা এখনও ফাইলপত্র নিয়ে আদালতের চত্বরে ঘুরে বেড়ান। ২০০১ সালে হওয়া ধর্ষণের বিচার হয় ২০১৭ আলে এসে।
বিচার চাইতে গেলেও কত ভোগান্তি, ধর্ষিতা একটা মেয়ে বা একজন নারীকে কোর্টরুমে দেহব্যবসায়ী প্রমাণ করার কতো চেষ্টাই না করা হয়। মানসিকভাবে প্রচণ্ড আঘাত পাওয়া একজন নারী এই ধাক্কাটা যে সবসময় নিতে পারেন এমনটাও তো না। আইন হবে জনবান্ধব, সেই আইন যখন ধর্ষনের শাস্তি দিতে বিলম্ব করে, ধর্ষকেরা তো উৎসাহী হবেই। যেখানে দ্রুত বিচারের আইনে ধর্ষণের বিচার হওয়া উচিত, সেখানে যদি একটা ধর্ষণের বিচার সম্পন্ন হতে হতে পনেরো বছর লেগে যায়, বিচার পাওয়ার আশাটুকুও ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় ভুক্তভোগী মানুষগুলো।
বাংলাদেশের লক্ষ-কোটি মানুষ ধর্ষণের পেছনে শুধু নারীদেরই দায় দেখতে পান, ‘বেপর্দা’ চলাফেরা কিংবা শালীনতার অভাবই নাকি শুধু ধর্ষণের কারণ, পুরুষ শুওরটির আদতে কোন দোষ নেই! এইসব পটেনশিয়াল রেপিস্টে ভরা দেশে ধর্ষণ মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়বে, এমনটাই তো স্বাভাবিক। এইসব মানুষের ভীড়ে বিউটিকে ধর্ষণের পরে হত্যা করা খুনীরা বুক ফুলিয়ে হেঁটে বেড়াবে, এমনটাই তো হবার ছিল। বিউটি তো মরে গিয়ে বরং বেঁচেই গেছে।
ভারতের অরুণাচলে কিছুদিন আগে দুই ধর্ষককে জেল ভেঙে বের করে এনে গণপিটুনি দিয়ে খুন করেছিল স্থানীয় জনতা। তারও কিছুদিন আগে ইয়েমেনে এক ধর্ষককে প্রকাশ্যে রাস্তায় হাজার হাজার মানুষের সামনে গুলি করে মেরেছিল সেদেশের সেনাবাহিনীর সদস্যেরা। আইন-আদালতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, আমাদের দেশেও এরকম কয়েকটা নজির স্থাপন করা খুব জরুরী হয়ে পড়েছে বোধহয়। ধর্ষকামী পশুগুলোর উত্তেজিত পৌরুষকে দমিয়ে রাখার জন্যে এই মূহুর্তে এর বিকল্প খুব বেশী নেই। যেমন কুকুর, তেমনই মুগুর হওয়া উচিত। তাতে যদি তনু-রূপা-বিউটিরা এই নির্মমতার হাত থেকে রক্ষা পায়!

তথ্য:

বিভাগ:

প্রকাশ: মার্চ ২৭, ২০১৮

প্রতিবেদক: প্রবাসীর দিগন্ত

সর্বমোট পড়েছেন: 3398 জন

মন্তব্য: 0 টি

সূত্র: এগিয়ে চলো

বিজ্ঞাপন জন্য স্থান
(আপনার বিজ্ঞাপনের জন্য আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন)