প্রশাসনিক দুর্নীতির আদি ও মূল রূপ হলো 'ঘুষ'

হামিদুর রহমান | ডেস্ক রিপোর্ট : এপ্রিল ২১, ২০১৮

প্রাচীন যুগে রাষ্ট্রের উদ্ভবের পর থেকেই দুর্নীতি হিসেবে ঘুষের প্রচলন। আমাদের দেশেও বহুযুগ আগে থেকেই তার প্রচলন দেখতে পাওয়া যায়। তবে তখনকার যুগে ঘুষ দেয়া-নেয়াটা ছিল অপ্রচলিত বিশেষ ঘটনা। রাষ্ট্রের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে তাকে প্রতিষ্ঠিত স্থান করে দেয়া হয় ব্রিটিশ শাসনামলে। কোম্পানির শাসনামলের ক্লাইভ, হেস্টিংস-এর কাল থেকেই ঘুষের প্রচলন নতুন মাত্রিকতায় উন্নীত হয়। সেসব ঔপনিবেশিক দেশ এখন সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে তাদের স্বার্থ সিদ্ধির নোংরা খেলা এখনো চলছে। পরিমাণ ও মাত্রায় তা আজ আরো বেড়েছে। অপ্রয়োজনীয় এমনকি ক্ষতিকর প্রজেক্ট, অসম নানা শর্ত চাপিয়ে দেয়া ইত্যাদি ছাড়াও প্রায় প্রকাশ্যভাবে কমিশনের লেনদেনের কারবারে তাদের ওস্তাদি এখনো ভালোভাবেই চলছে। ঘুষ-দুর্নীতির সেই রোগ থেকে আমাদের দেশের প্রশাসনকে মুক্ত করা তাই আজও সম্ভব হয় নি। বরং ঘুষের লেনদেন প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার একটি আবশ্যিক উপাদানে পরিণত হয়েছে। বিগত বি.এন.পি-জামাত জোটের শাসন আমলে ব্যাপক ভাবে এর বিস্তার লাভ করে।

ঘুষ দিয়ে রাজনীতিকেও ব্যাপকভাবে কলুষিত করার প্রক্রিয়া ১৯৭৫-এর পর জেনারেল জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনামলে অনেকটাই অফিসিয়ালি সূচিত হয়। জেনারেল জিয়া বলেছিলেন যে, তিনি রাজনীতিকে প্রচলিত রাজনীতিকদের জন্য ডিফিকাল্ট করে তুলবেন। রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাসহ প্রশাসনকে ব্যবহার করে টাকা-পয়সার লেনদেনের মাধ্যমে একশ্রেণীর রাজনীতিকদের কেনাবেচার প্রক্রিয়ার ব্যাপক প্রচলন ঘটানো হয়। জেনারেল এরশাদের আমলে দুর্নীতির প্রাইভেটাইজেশনের পথে বড় রকম সাফল্য । ঘুষের আদান-প্রদানের সাথে যুক্ত করা হয় টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, সামাজিক অপরাধমূলক কাজকর্ম ইত্যাদি। বিপুল পরিমাণ অবৈধ কালো টাকার কারবারের সাথে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন যুক্ত হয়ে স্থাপন করে একটি অদৃশ্য 'দুর্নীতি ইনডাস্ট্রি'। তার পরে এরশাদী স্বৈরশাসন উচ্ছেদ হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ৪/৫টি সরকারের আমলে এই 'দুর্নীতি-ইনডাস্ট্রি' শুধু বহালই থাকে নাই, তা আরো বিশাল শক্তিধর ও কর্তৃত্বাধীন হয়েছে।

অনেকের মতে দুর্নীতি করার ক্ষেত্রে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সমান ওস্তাদী দেখাতে পারলেও পদ্ধতির ক্ষেত্রে তাদের দু'পক্ষের মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে। উদাহরণ দিতে গিয়ে অনেকে এভাবে বলতো যে, আওয়ামী লীগের দুর্নীতিবাজরা বেনসন সিগারেটের প্যাকেটে স্টার সিগারেট ঢুকিয়ে বুক পকেট প্রদর্শন করে ঘোরাফেরা করে থাকে, আর বিএনপির দুর্নীতিবাজরা স্টারের প্যাকেটে বেনসন রেখে লোকজনের সামনে চলাফেরা করে থাকে। এই পর্যবেক্ষণটি সেই সত্তর-আশির দশক থেকেই প্রচলিত। এখনো তা অনেকটাই সত্য।

বিএনপি'র দুর্নীতি অনেক আধুনিক ও সুশৃঙ্খল পদ্ধতিতে পরিচালিত। বড় বড় অঙ্কের বিশাল সেসব লেনদেন ও পার্সেন্টেজের কারবার। শহরে আভিজাত্যের মোড়কে তা সুসজ্জিত। তাদের ক্ষেত্রে দুর্নীতির সিন্ডিকেট ব্যবস্থা মসৃন। নির্দিষ্ট ভবন ও কেন্দ্র থেকে তা পরিচালিত। নেটওয়ার্কের সবাই পরস্পরকে দুর্নীতির কাজে সহযোগিতা করে, সবাই দুর্নীতির ফসলের ভাগ পায়। সবাই সহজে সে লুটপাটের খবর টের পায় না। ঝাগড়া-বিবাদও কম হয়। একটি মসৃণ মেশিনের মতো সমস্ত প্রক্রিয়াটি কাজ করে যায়।

আওয়ামী লীগের দুর্নীতি সেই তুলনায় অনেকটাই অনাধুনিক ও গ্রাম্য ধাঁচের। তাদের দুর্নীতির সাংগঠনিক-প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা খুবই কাঁচা, এমনকি তা নেই বললেই চলে। উপর-নিচ সব ক্ষেত্রেই এখানে ব্যক্তিগত প্রয়াস ও একান্ত ব্যক্তিগত স্বার্থই দুর্নীতির প্রধান ভিত্তি। শৃঙ্খলার সাথে দুর্নীতির ফসল পরস্পর মিলে ভাগ বাটোয়ারা করে নিতে তারা কার্যত অপারগ। কেউ অন্য কাউকে ভাগ দিতে রাজি নয়। তাই লুটপাটের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে নিজেদের মধ্যে প্রকাশ্য সংঘাত, হানাহানি ও নৈরাজ্য অনেক বেশি। দুর্নীতির সমগ্র প্রক্রিয়া "পারসনালাইজম" হওয়ার কারণে তা এক অর্থে বিকেন্দ্রীভূত। তৃণমূল থেকে ঊর্ধ্বতন স্তর পর্যন্ত পর্যায়ে পর্যায়ে তা বিস্তৃত হলেও সব স্তরেই তার ক্রীড়নক ক্যাডার-কর্মী-নেতারা স্বাধীন-স্বতন্ত্র-স্বউদ্যোগী একেকটি বিচ্ছিন্ন দুর্নীতির ইউনিট। আওয়ামী লীগ প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ করেনি, কিন্তু দুর্নীতির বিকেন্দ্রীকরণ ভালোভাবেই করতে পেরেছে।দুর্নীতিবাজদের রুখতে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে হবে, জেহাদ করতে হবে, যুদ্ধ করতে হবে এদের বিরুদ্ধে। আজকে বাংলার জনগনের এক নম্বর কাজ হবে দুর্নীতিবাজদের বাংলার মাটি থেকে উৎখাত করা। গণআন্দোলন করতে হবে। এমন আন্দোলন করতে হবে যে, যে ঘুষখোর, যে দুর্নীতিবাজ, যে মুনাফাখোরঃ তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে।

বঙ্গবন্ধু দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে তৃণমূলে ছড়িয়ে দেয়ার ডাক দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই দুর্নীতিবিরোধী অভিযান নয়, বর্তমানে বরঞ্চ উল্টো দুর্নীতিই ছড়িয়ে পড়েছে তৃণমূল পর্যন্ত। আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব কি এই উল্টোমাত্রার পরিস্থিতি উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন? তারা কি দলকে ফিরিয়ে নিতে পারবেন বঙ্গবন্ধুর আহ্বানের ধারায় গ্রামে গ্রামে দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন সংগঠিত করতে? ইতিহাস এই শিক্ষাই দেয় যে, 'রাজনীতি হলো অর্থনীতিরই ঘনীভূত প্রকাশ'। একটি দল ও তার নেতৃত্ব কোনোদিন তার শ্রেণী স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে পারে না। তাই, একটি মহা জন জাগরণই কেবল প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তনের ধারা সূচনা করতে পারে। তার জন্য তরুন প্রজন্মের নেতৃত্বেস এখন বড় প্রয়োজন।

তথ্য:

বিভাগ:

প্রকাশ: এপ্রিল ২১, ২০১৮

প্রতিবেদক: হামিদুর রহমান

সর্বমোট পড়েছেন: 242 জন

মন্তব্য: 0 টি