বছরজুড়ে বিশ্বসাহিত্য

প্রবাসীর দিগন্ত | প্রবাসীরদিগন্ত ডেস্ক : জানুয়ারী ১৭, ২০১৮

বিশ্বসাহিত্যে ২০১৭ সালে উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো থেকে সবচেয়ে প্রভাববিস্তারি ঘটনাগুলোকে এখানে বাছাই করা হলো। যদিও ‘বিশ্বসাহিত্য’ বলা হলো, প্রকৃতপক্ষে বিশ্বসাহিত্যের উল্লেখযোগ্য ঘটনাসমূহের মধ্যে ইংরেজি ভাষাভাষী দুনিয়ায় যেগুলো আলোড়ন তুলেছে সেগুলোই এখানে প্রাধান্য পেয়েছে। ফলে ইংরেজিভাষী দুনিয়ার হেজিমনি এই লিস্টে দেখা যাবে।

নোবেলজয়ী কবি ডেরেক ওয়ালকটের মৃত্যু: সেন্ট লুসিয়ায় জন্মগ্রহণকারী বিশ্বখ্যাত কবি ও নাট্যকার ডেরেক ওয়ালকটের মৃত্যু ছিলো বছরের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। প্রথম ক্যারিবীয় হিসেবে ১৯৯২ সালে নোবেল সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হলে তার কবি খ্যাতি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ওয়ালকটকে নিয়ে দেশে-বিদেশে শোক প্রকাশ, স্মৃতিচারণমূলক ও মূল্যায়নধর্মী অজস্র লেখা প্রকাশিত হয়।

জন এ্যাশবেরির মৃত্যু: বিশ শতকের মার্কিন কবিতার দিকপাল জন এ্যাশবেরি। প্রায় সব উল্লেখযোগ্য জাতীয় পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত ও উদযাপিত হয়েছিলেন এই কবি। এ বছর নব্বই বছর বয়সে মৃত্যবরণ করেন এই খ্যাতনামা কবি। জন এ্যাশবেরির মৃত্যুবরণ ছিলো বছরের অন্যতম ঘটনা।

বব ডিলানের বিরুদ্ধে নোবেল ভাষণে কুম্ভিলকবৃত্তির অভিযোগ: ২০১৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারজয়ী বব ডিলান ২০১৭-তেও খবরের শিরোনাম হন। তার বিরুদ্ধে কুম্ভিলকবৃত্তির অভিযোগের কারণে। অভিযোগ ওঠে ডিলান তার নোবেল ভাষণের অংশবিশেষ স্পার্কনোটস (sparknotes) থেকে চুরি করেছেন। লেখক বেন গ্রাহাম সর্বপ্রথম এ ব্যাপারে ব্লগিং করেন। গ্রাহামের লেখার সূত্র ধরে ‘স্লেট' ম্যাগাজিন বিস্তারিত রিপোর্ট প্রকাশ করে। এন্ড্রিয়া পিটজার সেই রিপোর্টে স্পার্কনোটসের সাইটের ‘মবিডিক’ উপন্যাসের বিশ্লেষণ ও সারসংক্ষেপ এবং নোবেল ভাষণে ডিলানের মবিডিকের আলোচনার ভাষা তুলনা করে দেখা যায়, উভয়ের মধ্যে আশ্চর্য মিল। মবিডিক নিয়ে ডিলানের আলোচনার মোট ৭২টি বাক্যের মধ্যে এক ডজনেরও বেশি স্পার্কনোটসের সাথে অদ্ভুত মিলে যায়। তারপরও মজার ব্যাপার হলো, ডিলানের আলোচনার অনেকগুলো ফ্রেজ খোদ মবিডিক উপন্যাসেই নাই, যদিও স্পার্কনোটসে আছে। এরপর সমস্ত প্রধান মিডিয়া এ নিয়ে খবর ছাপে।

অবশ্য বহু বছর ধরেই বব ডিলানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মাত্রার কুম্ভিলকবৃত্তির অভিযোগ পরিচিত ঘটনা। এমনকি অনেকে তাকে ‘ম্যাগপাই অফ প্লেজিয়ারিজম’ বলেন। এবার নোবেল ভাষণেও ডিলানের চুরির অভিযোগ উঠলে শিল্প-সাহিত্য বিশ্বে স্বভাবতই তোলপাড় শুরু হয়।

মার্গারিট এ্যাটউডের বছর: বছরের শুরু থেকে কানাডার আইকনিক লেখক মার্গারিট এ্যাটউড ছিলেন আলোচনায়। তার ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত উপন্যাস হ্যান্ডমেইডস টেইলের টিভি সিরিজ এ্যাডাপটেশনের সম্প্রচার শুরু হয় বছরের শুরুতে। সিরিজটি শুধু দর্শকপ্রিয়ই হয়নি, সমালোচকদের প্রশংসাও কুড়িয়েছে। সিরিজটির কারণে তার বইয়ের বিক্রিও এ বছর ছিলো অস্বাভাবিক বেশি। সব মিলিয়ে মার্গারিট এ্যাটউডের জন্যে ২০১৭ সালটি ছিলো বেশ প্রাপ্তির।

অরুন্ধতী রায় ও সালমান রুশদির উপন্যাস: ভারতীয় ঔপন্যাসিক ও মানবাধিকারকর্মী অরুন্ধতী রায়ের ‘মিনিস্ট্রি অফ আটমোস্ট হ্যাপিনেস’ উপন্যাস নিয়ে হৈচৈ ছিল সাহিত্য দুনিয়ায়। প্রথম উপন্যাস ‘দ্য গড অফ স্মল থিংস’-এর জন্যে পেয়েছিলেন সম্মানজনক বুকার পুরস্কার। প্রায় ২০ বছর পর নতুন উপন্যাস নিয়ে এলেন অরুন্ধতী এ বছর। দ্বিতীয় উপন্যাস নিয়ে তাই সাহিত্য পাঠকের জল্পনা-কল্পনার শেষ ছিলো না। স্বভাবতই ইন্টারন্যাশনাল বেস্ট সেলার লিস্টে জায়গা করে নেয় তার নতুন এই উপন্যাস। ভারতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা উল্লেখযোগ্য ঘটনা যেমন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, রাজনৈতিক আন্দোলন, কাশ্মীর ইস্যু ইত্যাদি বিষয় উঠে এসেছে উপন্যাসটিতে।

সালমান রুশদির নতুন উপন্যাস ‘দ্য গোল্ডেন হাউস’-এর প্রকাশ ছিল এ বছরের অন্যতম ঘটনা। এটি লেখকের ত্রয়োদশতম উপন্যাস। মুম্বাই ও নিউইয়র্কের বিচিত্রধর্মী চরিত্রের সম্মিলন ঘটেছে উপন্যাসটিতে। সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত বইটি নিয়ে এখনও খুব ইতিবাচক রিভিউ তেমন দেখা যায়নি। তবে বেশ কয়েকটি নেতিবাচক রিভিউ প্রকাশিত হয়েছে প্রধান সংবাদমাধ্যমগুলোতে। রুশদির মতো সাহিত্যিক আইকনের নতুন বই প্রকাশ মানেই আলোচনার বিষয়। স্বাভাবিকভাবেই রুশদির বই প্রকাশ ছিলো বছরের অন্যতম সাহিত্যসংশ্লিষ্ট আলোচিত বিষয়।

কাজুও ইশিগুরোর নোবেলপ্রাপ্তি: সাহিত্যে কাজুও ইশিগুরোর নোবেলপ্রাপ্তি নিঃসন্দেহে বছরের বিশ্বসাহিত্যের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। অনেক জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে নোবেল একাডেমি-২০১৭ সালের সাহিত্যে নোবেলজয়ী হিসেবে জাপানী বংশোদ্ভুত ব্রিটিশ লেখক কাজুও ইশিগুরোর নাম ঘোষণা করে। সুইডিশ নোবেল কমিটির পক্ষ থেকে ইশিগুরোর প্রশংসা করে বলা হয় হয়: ‘এই লেখক নিজের আদর্শ ঠিক রেখে, আবেগপ্রবণ শক্তি দিয়ে বিশ্বের সঙ্গে আমাদের সংযোগ ঘটিয়েছেন’।

জর্জ সন্ডার্সের ম্যান বুকার পুরস্কার লাভ: আমেরিকান সাহিত্যিক জর্জ সন্ডার্সের ম্যান বুকার প্রাইজ প্রাপ্তি ছিলো বছরের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। মূলত ছোটগল্পকার হিসেবে আমেরিকায় সম্মানিত সন্ডার্স তার প্রথম উপন্যাস ‘লিংকন ইন দ্য বার্ডো’র জন্যে মর্যাদাপূর্ণ ম্যান বুকার পুরস্কার লাভ করেন। এতোদিন মার্কিন পাঠকের কাছে পরিচিত এই লেখক বুকারপ্রাপ্তির মাধ্যমে বিশ্বের অন্যান্য দেশের পাঠকের কাছেও পরিচিত হয়ে ওঠেন।

প্যারিস রিভিউ-এর সম্পাদকের পদত্যাগ: ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সাহিত্য বিশ্বে প্রভাব বিস্তার করা সাহিত্যপত্রিকা ‘প্যারিস রিভিউ’র সম্পাদক লরিন স্টেইনের পদত্যাগ ছিল এ বছরের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। লরিন স্টেইনের বিরুদ্ধে নারী সহকর্মীদের সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন আচরণের অভিযোগ ওঠে। প্যারিস রিভিউ’র অভ্যন্তরীণ সাব কমিটির তদন্ত চলাকালীন পদত্যাগপত্র জমা দেন স্টেইন। স্টেইন আরও জানান যে, নারী সহকর্মীদের সঙ্গে তার ব্যবহার অনাকাঙ্ক্ষিত দুঃখজনক ছিলো এবং তিনি সেজন্যে দুঃখপ্রকাশ করেন। প্রায় সব প্রধান সংবাদমাধ্যমে ফলাও করে সংবাদটি ছাপা হয়।

ছোটগল্প ‘ক্যাটপারসন' নিয়ে আলোচনা: বছরের শেষ দিকে নিউ ইয়র্কার-এ প্রকাশিত ছোটগল্প নিয়ে মার্কিন মুলুক ছিলো তোলপাড়। ভাইরাল এই গল্পটি তুমুল আলোড়নের জন্ম দিয়েছে। গল্পটি শুধু নিউ ইয়র্কারের সর্বাধিক পঠিত লেখাই ছিল না, ২০১৭ সালের সমস্ত প্রকাশিত লেখার মধ্যে সবচে বেশি পঠিত লেখাগুলির একটি। ক্রিস্টেন রোপেনিয়ান রচিত ‘ক্যাট পারসন' নামের গল্পটি মার্গো ও রবার্ট নামের দুই চরিত্রের মধ্যকার অস্বস্তিকর সম্পর্কের বয়ান। গল্পে দেখা যায় বছর বিশেকের তরুণী মার্গোর সাথে তার চেয়ে বয়োজেষ্ঠ রবার্টের সম্পর্ক হয় টেক্সিং-এর মাধ্যমে। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে যৌন সম্পর্ক হলেও মার্গো মন থেকে না চাইলেও না করতে পারে না রবার্টকে। নারীকে বিনয়ী ও মার্জিত থাকার যে সামাজিক চাপের মুখোমুখি হয়ে অনেক সময় মন থেকে না চাইলেও সম্মতি দিতে হয়, ‘না' বলার অপারগতার কারণে যে মানসিক ভায়োলেন্সের মুখোমুখি হতে হয় নারীকে গল্পটিতে তারই করুণ রূপ উঠে আসে। গল্পের শেষ হয় তিক্ততায় যেখানে মার্গো রবার্টকে ত্যাগ করে।

তথ্য:

বিভাগ:

প্রকাশ: জানুয়ারী ১৭, ২০১৮

প্রতিবেদক: প্রবাসীর দিগন্ত

সর্বমোট পড়েছেন: 439 জন

মন্তব্য: 0 টি