বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ব্যবস্থাপনায় চ্যালেঞ্জ

জাফর ফিরোজ | প্রবাসীরদিগন্ত ডেস্ক : এপ্রিল ৫, ২০১৮

১৬ কোটি ১৭ লাখ ৫০ হাজার মানুষের দেশে কম গুরুত্ব পাওয়া শিল্পের নাম চলচ্চিত্র শিল্প। এশিয়ার মধ্যে এই একটি দেশ যে দেশে প্রতিদিন চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট কোন না কোন ব্যক্তি বেকার হচ্ছে অথবা বন্ধ হচ্ছে কোন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান অথবা কোন সিনেমা হলের দরজা। ১৯৯০ সালে যেখানে ১৪৩৫টি সিনেমা হল ছিল সেখানে আজ সে সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪শ’তে। এতে সহজেই অনুমেয় যে নব্বইয়ের দশকে যে পরিমাণ চলচ্চিত্র নির্মাণ হতো সে তুলনায় বর্তমানে নির্মিত চলচ্চিত্রের সংখ্যা কমতে কমতে দশকের ঘরে চলে এসেছে। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী ২০১৭ সালে ৪৭টি বাংলা চলচ্চিত্র ছাড়পত্র পেয়েছে। তার মধ্যে কতটি সিনেমা হলে প্রদর্শিত হয়েছে তার হিসাব চলচ্চিত্র শিল্পকে কোনোভাবেই আশান্বিত করতে পারে না। বাংলাদেশে চলচ্চিত্র এমন একটি শিল্প যে শিল্প বিকাশের জন্য ব্যাংকের কোনো বিনিয়োগ নেই। কাগজে-কলমের চলচ্চিত্র শিল্প দিন দিন খারাপের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এত বিশাল সংখ্যক দর্শক থাকতেও এই শিল্প আজ হুমকির মুখে। চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নতির জন্য বেশি দূরে দৃষ্টি দেয়ার প্রয়োজন নাই। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের দিকে তাকালে দেখা যায় কত উচ্চমানের দক্ষ ব্যবস্থাপনায় তারা তাদের চলচ্চিত্র শিল্পকে পৃথিবীর উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। আজ ভারতের উচ্চ লাভজনক শিল্পের নাম চলচ্চিত্র। হলিউডের নামিদামি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান এখন বলিউডে নিয়মিত বিনিয়োগ করে লাভ সমেত অর্থ ফেরত নিয়ে যাচ্ছে।
আমাদের এই চলচ্চিত্র শিল্পকে বাঁচাতে আমাদেরই উদ্যোগী হতে হবে। পরিবর্তন আনতে হবে চলচ্চিত্র ব্যবস্থাপনায়, যা মোটেও কঠিন কিছু নয়। চলচ্চিত্রের এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য এখানে কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরা হলো-

এক. সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে
২০১০ সালে চলচ্চিত্রকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা করা হলেও একটি নতুন শিল্পকে কীভাবে এগিয়ে নিতে হবে তার জন্য সরকারিভাবে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা এই ৮ বছরেও গৃহীত হয়নি। কোনো ব্যাংকও এই খাতে বিনিয়োগের জন্য এগিয়ে আসেনি। চলচ্চিত্র এমন একটি ব্যয় বহুল শিল্প যেখানে ব্যক্তির চেয়ে সরকারের সহযোগিতার হাতটিই অগ্রগণ্য। ভারত ২০০১ সালে চলচ্চিত্রকে শিল্প হিসেবে ঘোষণার পর বসে থাকেনি। এই খাতে বিনিয়োগের জন্য সরকারিভাবে ব্যাংকগুলোকে উৎসাহিত করা হয়। নতুন মাল্টিপ্লেক্স নির্মাণের ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের কর অবকাশ ঘোষণা করা হয়। টিকিটের ওপর কর কমিয়ে দেয়া হয়। চলচ্চিত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ, গ্যাস, জমির মতো অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়ের ওপরও কর কমিয়ে দেয়া হয়। অন্যদিকে আমাদের দেশে তার উল্টা। যার জন্য প্রতিনিয়ত বন্ধ হচ্ছে সিনেমা হল আর কমে যাচ্ছে চলচ্চিত্র নির্মাণ সংখ্যা। নতুন কেউ এই শিল্পে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছে না। চলচ্চিত্র শিল্পকে বাঁচাতে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার কোনো বিকল্প নেই।

দুই. গবেষণা বাড়াতে হবে
যে কোনো ব্যবসা শুরু করার পূর্বে গবেষণাকে অপরিহার্য মনে করা হলেও চলচ্চিত্র ব্যবসার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ কর্তা ব্যক্তিরা তা উপেক্ষা করে চলেন। যাদের জন্য চলচ্চিত্র তৈরি হচ্ছে সেই দর্শক গল্পটি পছন্দ করবে কিনা অথবা গল্পের সঙ্গে চরিত্র যাচ্ছে কিনা অথবা যে টাকা বিনিয়োগ করা হচ্ছে তা আদৌ ফিরে আসবে কিনা তার ওপর গবেষণা বাড়াতে হবে। একজন সফল এবং দক্ষ ব্যবসায়ী কখনই মাঠ গবেষণা ব্যতীত ব্যবসায় নামতে পারেন না। চলচ্চিত্র শিল্পে গবেষণার অভাবের কারণে আমাদের দেশের বড় বড় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানকেও প্রতিনিয়ত লোকসান গুনতে হচ্ছে।

তিন. দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকতে হবে
প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না থাকার কারণে এই শিল্প শক্ত অবস্থানে দাঁড়াতে পারছে না। ব্যবসায় লাভ-ক্ষতি থাকেই। সেই লাভ-ক্ষতির কথা মাথায় রেখে ব্যবসায় নামতে হয়। কিন্তু অধিকাংশ প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানকে দেখেছি যারা একটি মাত্র চলচ্চিত্র করেই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে ফেলেছেন। তারা একটি সিনেমার পুঁজি নিয়েই এই ব্যবসায় নেমেছিলেন। অথচ আজ আমরা যে বড় বড় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান দেখছি তারাও প্রতিটা চলচ্চিত্রে সফল হতে পারেনি। কখনো তাদের একটি চলচ্চিত্রের আয় থেকেই ১০টি চলচ্চিত্রের বিনিয়োগ চলে আসছে।

চার. গল্পে ভিন্নতা থাকতে হবে
আমাদের লাভ স্টোরি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশে গল্পের অভাব নেই। নতুন নতুন গল্প নিয়ে চলচ্চিত্র তৈরি করতে হবে। গল্পের ভেতর থেকে ভেতরে প্রবেশ করতে হবে। এমনভাবে চিত্রনাট্য তৈরি করতে হবে যেন দর্শক মনে না করে অবাস্তব কিছু দেখছে। সুপারহিরো চলচ্চিত্রগুলো অবাস্তব হলেও চিত্রনাট্যের গাঁথুনি এতই নিখুঁত যে, এই ধরনের চলচ্চিত্র দেখার পর আমাদের সুপারম্যান বা স্পাইডারম্যান হতে ভেতর থেকে উৎসাহিত করে।

পাঁচ. দক্ষ ও শিক্ষিত জনবল
চলচ্চিত্র একক কোনো শিল্প নয়। এটি একটি যৌথ শিল্প। এখানে বিভিন্ন মেধার সমন্বয় প্রয়োজন। যেমন- চিত্রনাট্যকার, সংগীত পরিচালক, সিনেমাটোগ্রাফার, অভিনয়শিল্পী এবং পরিচালক। একটি সফল প্রযোজনার জন্য প্রয়োজন একটি দক্ষ টিম। যাদের থাকবে ব্যতিক্রমী মেধা এবং প্রযুক্তিতে দক্ষতা। সময়কে ধারণ করার সক্ষমতা থাকতে হবে।

ছয়. মাল্টিপ্লেক্স এবং নিরাপত্তা
দেশের প্রতিটি শপিং মলে মাল্টিপ্লেক্স তৈরি করতে সরকারকে আগ্রহী হতে হবে। আমাদের দেশে মাত্র দুটি মাল্টিপ্লেক্স। যার টিকিট বিক্রির হার সাধারণ সিনেমা হল থেকে অনেক বেশি। দর্শকরা চায় সুন্দর পরিবেশ এবং নিরাপত্তা। মাল্টিপ্লেক্সগুলো সেটা পাড়ছে বলেই দর্শক অনিরাপদ হল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। মাল্টিপ্লেক্সগুলো শুধু দর্শকের নিরাপত্তাই নিশ্চিত করছে না; নিশ্চিত করছে প্রযোজকের লাভ্যাংশও। ডিজিটাল টিকেটিং ব্যবস্থার কারণে ঘরে বসেই প্রযোজক দেখতে পাচ্ছেন কত টিকিট বিক্রি হচ্ছে। তাই চলচ্চিত্র শিল্পকে এগিয়ে নিতে মাল্টিপ্লেক্স নির্মাণের কোনো বিকল্প নেই এবং মাল্টিপ্লেক্স নির্মাণে সরকারকে কর মওকুফ করতে হবে।

সাত. প্রচারণা ও পণ্য
বর্তমানে চলচ্চিত্র হলে গিয়ে শুধু দেখেই না, চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত পোশাক এবং অন্যান্য দ্রব্যসামগ্রী বিভিন্ন শপিংমলে বিক্রির শীর্ষে থাকে। হলিউড এবং বলিউড চলচ্চিত্রকে এমনভাবে ডিজাইন করে যেন কস্টিউম বিক্রির অর্থ বক্স অফিসের আয়কেও ছাড়িয়ে যায়। টিকিট কেটে সিনেমা দেখে বের হয়ে সিনেমার পণ্য কিনে বাসায় নিয়ে আসে। আমাদের এই বিষয়গুলো নিয়েও ভাবতে হবে।
চলচ্চিত্র শিল্পকে লাভজনক করতে এখন প্রয়োজন সরকারের সুন্দর একটি পরিকল্পনা এবং চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনায় যৎসামান্য পরিবর্তন। তাহলেই বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প ঘুরে দাঁড়াবে।

তথ্য:

বিভাগ:

প্রকাশ: এপ্রিল ৫, ২০১৮

সর্বমোট পড়েছেন: 540 জন

মন্তব্য: 0 টি

সংশ্লিষ্ট সংবাদ