ভারতে শিশু ধর্ষণে মৃত্যুদণ্ডের আইন অনুমোদন

শেখ সেকেন্দার আলী | নিজস্ব প্রতিবেদক : এপ্রিল ২২, ২০১৮

১২ বছরের কম বয়সের শিশু ধর্ষণে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান করছে ভারত। ধর্ষণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার অংশ হিসেবে এ সংক্রান্ত প্রস্তাবটি দেশটির মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পেয়েছে। শনিবার মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এটি অনুমোদন দেন। খবর এনডিটিভি।

জানুয়ারিতে জম্মু ও কাশ্মিরের কাঠুয়ায় যাযাবর সমপ্রদায়ের আট বছরের এক শিশুকে অপহরণ ও মন্দিরে আটকে রেখে সাত দিন ধরে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতজুড়ে ক্ষোভের মুখে গত সপ্তাহে নারী ও শিশু উন্নয়ন বিষয়ক ইউনিয়ন মন্ত্রী মানেকা গান্ধী মন্ত্রিসভায় এই প্রস্তাব পেশ করেন। যদিও এ ধরনের প্রস্তাব এবারই প্রথম নয়।

২০১২ সালে রাজধানী দিল্লিতে বাসে ‘নির্ভয়া’ ধর্ষণকাণ্ডের পরও একই প্রস্তাব তোলা হয়েছিল। কিন্তু সেবার মন্ত্রিসভায় ওই প্রস্তাব অনুমোদন পায়নি। গত জানুয়ারিতে মোদি সরকার ধর্ষণের আইনগুলো পুনর্বিবেচনার জন্য প্রস্তাব উত্থাপন করে। সে সময় সরকারি আইনজীবীরা সুপ্রিম কোর্টে বলেছিলেন, মৃত্যুদণ্ডাদেশই শেষ কথা নয়। কাশ্মিরের কাঠুয়া ও উত্তর প্রদেশে ধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফের বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে ভারত। কিন্তু উভয় ঘটনাতেই বিজেপির নেতারা ধর্ষকদের বাঁচাতে চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ ওঠে।

ভারতের বর্তমান আইনে অপ্রাপ্তবয়স্ক ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন এবং সর্বনিম্ন সাজা সাত বছরের কারাদণ্ড। কিন্তু দেশটিতে অপ্রাপ্তবয়স্ক ধর্ষণের অভিযোগে সাজা হওয়ার হার খুবই কম। অপ্রাপ্তবয়স্ক ধর্ষণের অভিযোগ ওঠা প্রতি ১০ জনে মাত্র ৩ জনের সাজা হয়, বাকিরা প্রমাণের অভাবে খালাস পেয়ে যায়।

৮ মাসের শিশু ধর্ষণ ও হত্যা

ধর্ষণ মহামারী রূপ নিয়েছে ভারতে। এই পাশবিকতার সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছে শিশুরা। কোলের শিশুরাও রেহাই পাচ্ছে না। কাঠুয়ার ঘটনা নিয়ে আন্দোলন-বিক্ষোভের মধ্যেই আট মাসের এক শিশু ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে। খবর এনডিটিভি।

খবরে বলা হয়, ইনডোরে মা-বাবার পাশে ঘুমিয়ে ছিল শিশুটি। স্থানীয় সময় শুক্রবার ভোরে সেখান থেকে শিশুটিকে তুলে নিয়ে গিয়ে ৫০ মিটার দূরে ভবনের বেজমেন্টে ধর্ষণ করে ২১ বছর বয়সী এক যুবক। সিসিটিভির ফুটেজে দেখা গেছে, অভিযুক্ত যুবক কোলে করে বাচ্চাটিকে নিয়ে যায়। ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করে। কয়েক ঘণ্টা পরে এক দোকানি তার দোকান খুলতে এসে বেজমেন্টে শিশুটির মরদেহ দেখতে পান। পুলিশ জানায়, শিশুটির মা-বাবা বেলুন বিক্রেতা। শহরের রাজওয়াদা ফোর্টের বাইরের ফুটপাথে মেয়েকে নিয়ে তারা ঘুমিয়েছিলেন। অভিযুক্ত ব্যক্তি ওই পরিবারের ৮পরিচিত এবং ঘটনার দিন তাদের সঙ্গেই ছিল।

ইনডোর পুলিশের ডিআইজি এইচসি মিশ্র জানান, সিসিটিভির ফুটেজে দেখা গেছে, শুক্রবার ভোর পৌনে পাঁচটার দিকে অভিযুক্ত বাচ্চাটিকে সড়ক থেকে ৫০ মিটার দূরে একটি ভবনের বেজমেন্টে নিয়ে যাচ্ছে। এরপর বিকালে সেখান থেকে বাচ্চাটির লাশ উদ্ধার করা হয়। তিনি আরো বলেন, বাচ্চাটির মাথার জখম দেখে ধারণা করা হচ্ছে, ধর্ষণের পর তাকে বেজমেন্টে ছুড়ে ফেলা হয়েছে। শিগগিরই আমরা ধর্ষককে ধরতে সক্ষম হব।

ভারতে বেড়েই চলেছে ধর্ষণ

ভারতে বেড়েই চলেছে শিশুধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা। চলতি সপ্তাহে দেশটিতে অন্তত ৭ শিশু ধর্ষণ-হত্যার শিকার হয়েছে। ২০১২ সালের পর ধর্ষণ বেড়েছে ৬০ ভাগ। ধর্ষণের বিরুদ্ধে একের পর এক কঠোর আইন করেও তা রোধ করা যাচ্ছে না। খবর আনন্দবাজার পত্রিকা।

২০১২ সালের ডিসেম্বরে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে চলন্ত বাসে এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের ঘটনায় বিক্ষোভে উত্তাল হয় গোটা ভারত। এরপরই আইন সংশোধন করে ধর্ষণের অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হয়। সে সময় ১২ বছরের কম বয়সীদের নির্যাতনে জড়িতরা সেই আইনের বাইরে ছিল। কিন্তু শনিবার শিশু ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের আইন করার প্রস্তাবটি অনুমোদন দেয় মোদি সরকার।

এত কিছুর পরও থেমে নেই ধর্ষণের ঘটনা। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, দুই বছরে অপরাধের মাত্রা আরো বেড়েছে। শিশুরাই শিকার হচ্ছে বেশি। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর (এনসিআরবি) পরিসংখ্যান মতে, ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দেশটিতে ধর্ষণ বেড়েছে ৬০ ভাগ। বেশি শিকার হচ্ছে শিশুরা। কিন্তু বিচারে অভিযুক্তের হার ২৫ শতাংশ থেকে বাড়েনি।

২০১৬ সালে দেশটিতে ধর্ষণের ৩৯ হাজার অভিযোগ দায়ের হয়। এর মধ্যে ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রেই ধর্ষণের শিকার হয়েছিল শিশুরা। সে ক্ষেত্রে ৬ বছরের কম বয়সী শিশুরাও রেহাই পায়নি। ৬ থেকে ১২ বছরের শিশুরা ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪-৫%। ১২ থেকে ১৬ বছরের কিশোরী ধর্ষণের হার ১৮ শতাংশ। যদিও নির্ভয়াকাণ্ডের পর সরকার ধর্ষণ আইন কঠোরতর করেছিল। ধর্ষকের শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হয়েছিল। এ ছাড়া ধর্ষণ মামলাগুলোর শুনানি দ্রুততর করতে দেশে ফাস্ট ট্র্যাক আদালতের সংখ্যা বাড়ানো হয়।

কিন্তু তারপরও ধর্ষণের ঘটনার ঊর্ধ্বগতি রুখতে পারেনি পুলিশ। বরং অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের ক্ষেত্রে পুলিশের গাফিলতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নির্ভয়াকাণ্ডের পর ব্যাপক সংখ্যক ফাস্ট ট্র্যাক আদালত চালু হলেও ধর্ষণের মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির স্বপ্ন অধরাই থেকে গেছে।

এনসিআরবির পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ২০০৬ থেকে ২০১২ পর্যন্ত ধর্ষণের ঘটনা ততটা বাড়েনি। তবে ২০১৩ সাল থেকে এ সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে শুরু করে। ২০১২ সালে যে সংখ্যাটা ছিল ২৫ হাজারের কাছাকাছি, এক বছরের মধ্যেই (২০১৩) তা ৩৫ হাজার পেরিয়ে যায়। আর ২০১৬ সালে তা পৌঁছে যায় ৪০ হাজারের কাছাকাছি। ধর্ষণের শিকার বেশি হচ্ছেন ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে থাকা কিশোরী ও যুবতীরা। সেই হার ৪০ শতাংশেরও বেশি।

২০১২ সালে ধর্ষণের যতগুলো অভিযোগ দায়ের হয়েছিল তার ২৫ শতাংশ ক্ষেত্রে শাস্তি হয়েছিল অপরাধীদের। নির্ভয়াকাণ্ডের জেরে ধর্ষণ আইন কঠোরতর ও অসংখ্য ফাস্ট ট্র্যাক আদালত চালুর পাঁচ বছর পরও শাস্তির হার সেই ২৫ শতাংশই থেকে গেছে। এ ব্যাপারে আদালতের ছবিটাও আশাব্যঞ্জক নয়। ২০১২ সালে দেশের আদালতগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা মামলার সংখ্যা ছিল এক লাখ। আর পাঁচ বছর পর সে সংখ্যাটা পৌঁছেছে ১ লাখ ৩৩ হাজারে।

তথ্য:

বিভাগ:

প্রকাশ: এপ্রিল ২২, ২০১৮

সর্বমোট পড়েছেন: 455 জন

মন্তব্য: 0 টি

সংশ্লিষ্ট সংবাদ