মালয়েশিয়ায় রেমিটেন্স যোদ্ধাদের মানবেতর দিনযাপন

আহমাদুল কবির | নিজস্ব প্রতিবেদক : মার্চ ২৪, ২০১৮

মালয়েশিয়ায় একটি কোম্পানিতে অসহায় হয়ে পড়ে আছেন বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক শ্রমিক। দেশটির সরকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দিনের পর দিন ঠকিয়ে যাচ্ছে সেলাঙ্গুর প্রদেশের শাহ আলম এলাকায় তিলকগংয়ে অবস্থিত "হাপ চুং উড প্রোডাক্ট ইন্ডাসট্রিয়াল" নামে একটি কোম্পানি।

ভাগ্যন্নোয়নের আশায় সহায় সম্বল বিক্রি এবং চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সাড়ে তিন লাখ থেকে চার লাখ টাকা খরচ করে মালয়েশিয়া গিয়েছেন এই শ্রমিকরা। উদ্দেশ্য- নিজের ও পরিবাবের সদস্যদের মুখে হাসি ফুটানো। কিন্তু হাসি ফুটানো তো দূরে থাক, এই শ্রমিকরা নিজেরা সেখানে মানবেতর দিন-যাপন করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ১০০০ রিঙ্গিত বেসিক ও ওভারটাইম ভাতা বেসিকের দেড়গুণ এবং সরকারি ছুটির দিনে কাজ করলে বেসিকের দুই গুণ দেয়ার কথা থাকলেও কোনো ওভারটাইম-ই দিচ্ছে না। কন্ট্রাক্ট পেপারে সাইন করলেও বাস্তবে হচ্ছে তার উল্টো। প্রতি মাসের ৭ তারিখে বেতন দেয়ার কথা থাকলেও মাসের ২০-২২ তারিখের আগে বেতন দেয়া হয় না । কিন্তু দেশের এনজিও এবং ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এসব মানছে না। তারা মাসের ১০ তারিখ পার হলেই প্রবাসীর বাড়ি এসে কিস্তির জন্য চাপ দিচ্ছে। 

এছাড়াও কোন শ্রমিক অসুস্থ হলে তাকে মেডিকেলে নিতে গড়িমসি কওে কোম্পানী কর্তৃপক্ষ। ৪-৫ দিন পর মেডিকেলে নেয় তাও আবার বিকাল ৫ টার পর। অথচ ৫টার পর হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার থাকেন না। এছাড়া অস্স্থু কেউ কাজ না করলে তাকে গুনতে হয় জরিমানা এবং যত ঘন্টা কাজ না করবে পরবর্তীতে ওভারটাইম করে বেসিক পুরণ করতে হয়। বিশেষ করে মালয়েশিয়ান সরকার প্রবাসীদের ভিসার ফি (লেভি) ফ্রি করলেও ওই কোম্পানি শ্রমিকদের বেতন থেকে লেভি কেটে নিচ্ছে। অথচ জানুয়ারি ২০১৮ থেকে কোনো কোম্পানি প্রবাসী শ্রমিকদের বেতন থেকে লেভি আদায় করলে কোম্পানির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার আদেশ থাকলেও তারা এ আদেশের তোয়াক্কা করছে না। উল্টো লেভির বিষয়ে কথা না বলার জন্য শ্রমিকদের বিভিন্ন হুকমি-ধামকি দিচ্ছে কোম্পানির কর্তারা।

এ দিকে লেভি কাটা নিয়ে অবিনব কায়দা অলম্বন করছে সংশিষ্ট কোম্পানি, জানুয়ারি ২০১৮’র পূর্বে প্রত্যেক মাসের বেতনসিটে লেভি ১৫৫ রিঙ্গিত হোস্টেল ভাড়া ৫০ রিঙ্গিত উল্লেখ থাকলেও জানুয়ারি থেকে বেতনসিটে লেভি ও হোস্টেল ফি উল্লেখ থাকছে না। শুধু ২৫৫ রিঙ্গিত উল্লেখ থাকায় শ্রমিকরা অফিস কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাইলে এ বিষয়ে কথা না বলার জন্য হুমকি দেয়া হয়। 

এছাড়াও পুরাতন যেসব বাংলাদেশি শ্রমিকরা কাজ করছেন তাদের বৈধ হয়েও সারাবছর অবৈধ হয়ে থাকতে হয়, কারণ পুরাতন শ্রমিকদের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার এক-দুই মাস আগে ভিসার ফটোকপি হাতে ধরিয়ে দেয়া হয়। ভিসার কপি হাতে না থাকায় ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে টাকা পাঠাতে পারছেনা শ্রমিকরা। সেকারণে একদিকে যেমন দেশে টাকা পাঠাতে খরচ বেশি হচ্ছে অন্যদিকে সরকারও রেমিটেন্স হারাচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এ কোম্পানীর একজন শ্রমিক এ প্রতিবেদককে জানান, গতবছরের নভেম্বর-ডিসেম্বরে কলিং ভিসায় ৩৩ জন শ্রমিক বাংলাদেশ থেকে এসেছেন। অথচ এসব শ্রমিক আসার আগে মালয়েশিয়াস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশনের একটি প্রতিনিধিদল কোম্পানি পরিদর্শনকালে কোম্পানির বিভিন্ন সমস্যার কথা জানতে পারেন, যেসব বাংলাদেশি শ্রমিকরা কয়েক বছর ধরে কাজ করছেন তারা হাইকমিশনের প্রতিনিধি দলকে বিনয়ের সাথে অনুরোধ করেন অত্র কোম্পানিতে বাংলাদেশি শ্রমিক না দেয়ার জন্য। কারণ তারা চায়নি আর কোন বাংলাদেশি ভাই যেন তাদের মত মানবেতর জীবন যাপন করুক। প্রতিনিধি দল অত্রকোম্পানীর পরিবেশ ও অন্যান্য বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ফিরে যান তারপরেও কিভাবে কার পকেটে বিশেষ সুবিধা দিয়ে এ কোম্পানি বাংলাদেশি শ্রমিক এনেছেন সেটা হয়তো গোপন থেকে যাবে....।

এ বিষয়ে প্রতিকারের জন্য প্রবাসী শ্রমিকরা বাঙালি এজেন্সির সাথে যোগাযোগ করলে এজেন্সি শ্রমিকদেরকে পাত্তা দিচ্ছে না। অন্যদিকে অনেক শ্রমিক হতাশ হয়ে পরিবার ও নিজের জীবন অন্ধকারে ঠেলে দিয়ে অবৈধ হয়ে পড়ছেন। অথচ ভাগ্য বদলের স্বপ্ন নিয়ে বিদেশ এসেছেন তারা।

ন্যায্য অধিকার বঞ্চিত বাংলাদেশি শ্রমিকদের মানবেতর জীবন থেকে বাঁচাতে এবং প্রাপ্য অধিকার পাওয়ার ব্যবস্থা করতে মালয়েশিয়াস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে জানতে দূতাবাসে যোগাযোগ করা হলে দূতাবসের শ্রম সচিব মো: হেদায়েতুল ইসলাম মন্ডল এ প্রতিবেদককে বলেন, এ রকম কোনো অভিযোগ দূতাবাসে আসেনি। তিনি বলেন, জিটুজি প্লাাস কর্মীদের বারবার জানন দেয়া হচ্ছে। এমপ্লয়মেন্ট চুক্তি মেনে চলতে। যে কোন সমস্যা (মালয়েশিয়ায় বা বাংলাদেশে) হলে হাইকমিশনকে জানাতে। কারন এমপ্লয়মেন্ট চুক্তিতে শ্রমিকদের অনেক অধিকার আছে। তারমধ্যে একটি হচ্ছে, কোম্পানি ছেড়ে দেওয়ার অধিকার। তাই কোনভাবেই কোম্পানি থেকে পালাবেন না। এ ছাড়া বেতন/ভাতাদি পরিশোধে কোনো সমস্যা হলে হাইকমিশনে +৬০১২৪৩১৩১৫০;০১২২৯৪১৬১৭, ্ ০১২২৯০৩২৫২ ফোন করে বা মেসেজ দিয়ে জানাতে বলা হয়েছে।

যতই প্রলোভন দেখানো হোকনা কেন অনুগ্রহ করে কোম্পানি থেকে পালিয়ে না যাবার পরামর্শ দিয়েছেন এ কর্মকর্তা।

তথ্য:

বিভাগ:

প্রকাশ: মার্চ ২৪, ২০১৮

সর্বমোট পড়েছেন: 1228 জন

মন্তব্য: 0 টি

সংশ্লিষ্ট সংবাদ