মালয়েশিয়া ভ্রমণের কাহিনী

ইমতিয়াজ সিফাত | প্রবাস ডেস্ক : মার্চ ২৭, ২০১৮

মালয়েশিয়ার ট্যুরিসমের একটা ট্যাগলাইন আছে যেটা আমরা বিভিন্ন সময় টিভিতে দেখে অভ্যস্ত। ট্যাগলাইনটা হল ‘Truly Asia in Malaysia.’ প্রথম প্রথম দেখে মনে হতে পারে আরে এ তো দেখি তাজ্জব ব্যাপার! কিভাবে সম্ভব পুরা এশিয়াকে দেখা একটি মাত্র দেশ ভ্রমণের মাধ্যমে? হ্যাঁ সম্ভব; এখানে একটা এলাকার সাথে আরেকটা এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর ভূ-তাত্ত্বিক দিয়ে মিল একবারেই কম এবং কোন জায়গার চেয়ে কোনটা কম সুন্দর নয়। যে যার যার মত ইউনিক। মালয়েশিয়ার সরকার ট্যুরিসমকে সারা বিশ্বের ট্যুরিস্টদের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য প্রতিনিয়ত নানারকম টিভিসি তৈরি করে যাচ্ছে; দেশের ইকোনমিক অবস্থা শক্তিশালী হচ্ছে ট্যুরিসমের উপর নির্ভর করে।আর তাই ট্যুরিসমের উপর আর সারা বিশ্বের ভ্রমণপিপাসু মানুষদের কাছে অন্যতম ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন হিসাবে মালয়েশিয়ার গ্রহণযোগ্যতা দিন দিন বাড়ছে। মালয়েশিয়া শুধু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নয় বরং এশিয়ার অন্যতম কসমোপলিটান দেশ। যে যে বৈশিষ্ট্যের জন্য একটা দেশকে কসমোপলিটান বলা যায় তার সবকয়টাই এই দেশটার মধ্যে বিদ্যমান। একটা কসমোপলিটান দেশের মানুষেরা একটি একক কমিউনিটিতে বিশ্বাস করে এবং এই কমিউনিটিটা সাধারণত নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, মূল্যবোধ,সুন্দর অর্থনৈতিক সম্পর্ক আর শক্তিশালী রাজনৈতিক কাঠামোর উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে। এই যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ আর মূল্যবোধের যে সম্পর্ক সেটা যেমন এদেশের নাগরিকেরা মেনে চলে ঠিক তেমনি এটা এখানে যারা বেড়াতে আসে তাদের আচার-আচরণে ও লক্ষ্য করা যায়।


মালয়েশিয়া ভ্রমণ

মালয়েশিয়া এত বড় একটা দেশ যে পুরোটা দেখতে হলে বেশ কয়েকবার সেখানে যাওয়া চাই।প্রথমবার ভ্রমণে প্ল্যান ছিল কুয়ালালামপুর শহরের আশপাশ ঘুরে দেখা আর শহর থেকে কাছাকাছি দূরত্বের শহরগুলোতে ঘুরে আসা। প্ল্যান মোতাবেক গত বছরের সেপ্টেম্বরে এক সপ্তাহের জন্য মালয়েশিয়ায় গিয়েছিলাম। সাথে ছিল আব্বু,আম্মু আর ছোট বোন। মালয়েশিয়ার আবহাওয়া সাধারণত গরম এবং আদ্রতা বেশি বাতাসে। বৃষ্টিপাত না হলে সারা বছরের যে কোন সময় মালয়েশিয়ায় ঘুরতে যাওয়া যায়। দেশের পূর্বদিকের এলাকাগুলোতে নভেম্বরের মাঝা-মাঝি হতে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বৃষ্টিপাত বেশি হয় আর পশ্চিমদিকের এলাকাগুলোতে সেপ্টেম্বর আর অক্টোবরের দিকে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা বেশি। বৃষ্টি মৌসুমে ঘুরতে গেলে ঘুরাঘুরি না করে হোটেলে বসে দিন কাটানোর সমূহ সম্ভাবনা থাকতে পারে। তাই যাওয়ার আগে ওয়েদার ফরকেস্ট চেক করে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।


কুয়ালালামপুর ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট।

সেপ্টেম্বরের আট তারিখ রাতে আমাদের যাত্রা শুরু হল।হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে মালয়েশিয়াগামী মালিন্দো এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ছিল রাত ১০:৫০ মিনিটে। প্লেন মালয়েশিয়া থেকে যাত্রী নিয়ে ঢাকায় ফিরতে দেরি করায় ফ্লাইট টাইম ১০:৫০ থেকে পিছিয়ে যায় ১১:৫০ টায়। তো ১১:৫০ এ প্লেন ছাড়ল। মালিন্দো বাজেট এয়ারলাইন্স। প্লেনে খাবারের মান ভালোই ছিল। কিন্ত, এয়ার কন্ডিশনের অবস্থা তেমন একটা ভালো ছিল না। আর ইকোনমিক ক্লাসের সিট বেশ কনগেস্টেড লাগসে আমার কাছে। তবে বাজেট এয়ারলাইন্সের কাছ থেকে খুব ভালো আশা করাটা আসলে বোকামি হবে।যাই হোক ৩:৩০ টার সময় মালয়েশিয়ায় পৌঁছালাম। কুয়ালালামপুর ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টটা খুব সুন্দর, একবারে সাজানো গোছানো। ইজি চেয়ারে শুয়ে রেস্ট নিচ্ছে কেউ কেউ, আবার অনেকে আরামে ঘুমাচ্ছে। আবার, কেউ কেউ ইজি চেয়ারে বসে হাই স্পীড ইন্টারনেটে নেট ব্রাউজিং করতেছে। প্লেন থেকে নেমে হেঁটে হেঁটে এয়ারপোর্টটা ঘুরে দেখলাম, তারপর লাগেজ ক্লিয়ারেন্স আর ইমিগ্রেশন ঝামেলা শেষ করতে করতে ৫:৩০ টা বেজে গেল। আগে থেকে সুইস ইন হোটেলে বুকিং দেয়া ছিল। এয়ারপোর্ট থেকে একটা গাড়ি ভাড়া করে হোটেলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। সেদিন অবশ্য কুয়ালালামপুরে প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। ভাগ্য ভালো পরের এক সপ্তাহে আর কোনরকম বৃষ্টির দেখা পাইনি। এম্নিতে প্লেন জার্নি করে ক্লান্ত ছিলাম, তাই ঘুম ঘুম চোখে মালয়েশিয়ার কিছু এলাকা দেখতে দেখতে ১: ৩০ ঘন্টা পরে হোটেলে চলে আসলাম।

সকাল সকাল হোটেলে পৌঁছে গাড়ি থেকে লাগেজ নামিয়ে সুইস হোটেলের নিচ তলায় কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। রিসিপশনিস্ট আসার পর তাকে আগে বুকিং দেয়ার কথা জানালে পরে সে পাঁচ তলায় তিন বেডের একটা এয়ার কন্ডিশনড রুমের ব্যবস্থা করে দেয়। রুমের জানালা দিয়ে কুয়ালালামপুরের মিনারা টাওয়ার আর পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার দেখতে পেলাম। যে টুইন টাওয়ারকে এতদিন ছবিতে দেখেছি এখন চোখের সামনে  দেখছি, তাও আবার রুমের জানালা দিয়ে দেখছি এটা ভাবতেই অন্যরকম একটা ভালোলাগা কাজ করলো। যাই হোক রুমে এসে কিছুক্ষণ পর ফ্রেশ হয়ে নীচে নামলাম কারণ ক্ষুধার জ্বালায় পেট চো চো করছিল অনেকটা সময় ধরে। রাস্তা পাড় হয়ে একটা রেস্টুরেন্টে গেলাম। রেস্টুরেন্টোটারর মালিক একজন বাঙালি। তিনি যথাসাধ্য আদর-আপ্যায়ন করলেন। খাবার হিসাবে নিলাম রাইস, সার্ডিন ফিস, বিশেষ মসলা দিয়ে রান্না করা মুরগী আর সবজি। সার্ডিন ফিস মালয়েশিয়ায় খুব জনপ্রিয়। মোট্মুটি সব রেস্টুরেন্টে সার্ডিন ফিসের একটা আইটেম থাকবেই। সবশেষে চা খেলাম। ঘন দুধ দিয়ে বানানো চা খেতে দারুণ ছিল।

খাওয়া-দাওয়ার পর আশাপাশে কিছু জায়গায় ঘুরলাম, রাস্তার পাশেই একটা সুন্দর ঝরণা ছিল। সেখানে বসে কিছু সময় কাটালাম। প্ল্যান করলাম বিকালে কুয়ালালামপুর সিটি গ্যালারী আর সন্ধ্যায় পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার ঘুরে দেখব। অবশ্য মাঝখানে শহরের রাস্তায় হেঁটে বেড়িয়েছি কিছুটা সময়। আমার মনে হয় নতুন কোন শহরে ঘুরতে গেলে হেঁটে হেঁটে ঐ শহরটা ঘুরে দেখার চেয়ে মজার আর কিছু হতে পারে না। অনেক কিছু শেখা যায় এতে। মানুষের কালচার, আচার-আচরণ, পছন্দ-অপছন্দ এসব ব্যাপারে কিছুটা হলেও আইডিয়া করা যায়। ইউরোপিয়ানরা যেটা করতে পছন্দ করে তা হল তারা ব্যাপক হাঁটাহাঁটি করতে পছন্দ করে। পারলে হেঁটেই  পুরো শহর এক্সপ্লোর করে ফেলে এমন  অবস্থা। কিন্তু আমরা বাঙ্গালিরা সামান্য দূরত্বের জায়গাতেও হেঁটে যেতে ইচ্ছুক না, বরং কোন না কোন যানবাহন  ব্যবহার করি।

দুপুরবেলা হোটেলের কাছে একটা ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে খেয়ে আবার হোটেলে চলে গেলাম। বিকালের দিকে বের হলাম সিটি গ্যালারী দেখব বলে। সিটি গ্যালারী আমাদের হোটেলের পাশেই ছিল। মারদেকা স্কয়ারের রাস্তা ধরে কিছু দূর সামনে এগুলেই এই গ্যালারী। গ্যালারীতে পাঁচ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত টিকিট কেটে ঢুকলাম। এক রিঙ্গিত মানে বাংলাদেশী টাকায় বিশ টাকা। গ্যালারীতে মনোমুগ্ধকর লেজার শো এর মাধ্যমে মালয়েশিয়ার স্বাধীনতার ইতিহাস, বিখ্যাত মানুষদের অবদান, বিখ্যাত স্থাপনা, ট্যুরিস্ট স্পট এসবের ব্যাপারে ট্যুরিস্টদের আইডিয়া দেয়া হয়। এই লেজার শো এর দিকে মুগ্ধনয়নে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন যে বিশ মিনিট পাড় হয়ে গেল টের পেলাম না। লেজার শো দেখে গ্যালারীর ভেতরের দোকান থেকে কিছু স্যুভিনিয়র কিনলাম। দোকানের সব প্রোডাক্টই একবারে জেনুইন এবং ফিক্সড প্রাইস, তাই কোন প্রকার বার্গেইনিং করা গেল না। তবে মালয়েশিয়াতে কিছু মার্কেট আছে যেখানে বার্গেইন করা যায় কেনাকাটার সময়। মালয়েশিয়ার শপিং নিয়ে লেখার সময় বিস্তারিত লিখবো এটা নিয়ে।  সিটি গ্যালারীর সামনের রাস্তায় ‘ আই লাভ কেএল’ লেখা নামক একটা স্থাপনার সামনে ছবি তোলার জন্য মানুষের ভীড় লেগেই ছিল যেটা গ্যালারীতে ঢুকার সময়ই লক্ষ্য করেছিলাম। তাই গ্যালারী থেকে বের হয়েই ছবি তোলার জন্য দৌড় দিলাম যদিও ছবি তোলার সুযোগের অপেক্ষা আসতে আসতে বেশ খানিকটা সময় চলে গেল।

   ছবি : কুয়ালালামপুর সিটি গ্যালারীর সামনের ‘আই লাভ কেএল’
 

সিটি গ্যালারীতে ভালো কিছু সময় কাটিয়ে ট্যাক্সিতে করে রওয়ানা দিলাম পেট্রোনাস টুইন টাওয়ারের উদ্দেশ্যে। আর তখন ও সন্ধ্যা নামেনি। সন্ধ্যা নামার কিছু পূর্বেই চলে আসলাম টুইন টাওয়ারের কাছে। টুইন টাওয়ার একসময় বিশ্বের উচ্চ-তম বিল্ডিং ছিল ছিল। বিশ্বের উচ্চ-তম   বিল্ডিং এর খেতাব হারালেও  এখনো বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু টুইন টাওয়ারের খেতাব ধরে রেখেছে এই পেট্রোনাস টাওয়ার। ফ্রান্সের যেমন আছে আইফেল টাওয়ার, দুবাইয়ের যেমন আছে বুর্জ খলিফা, তাইওয়ানের যেমন আছে তাইপে ১০১ ঠিক তেমনি মালয়েশিয়ার ও আছে পেট্রোনাস টাওয়ারস। সত্যিকার অর্থে বলতে গেলে এই পেট্রোনাস টাওয়ার দেখতেই প্রতিবছর কয়েক লাখ ট্যুরিস্ট কুয়ালালামপুরে বেড়াতে আসেন। যথারীতি এখানে ও অনেক ভীড় ছিল, মানুষজন যে যার মন মত ছবি তুলে যাচ্ছে টাওয়ারকে ব্যাকড্রপ করে।  রাতের টুইন টাওয়ার দেখতে অসাধারণ। শুধু টুইন টাওয়ার ই নয় এর আশে পাশের স্কাই-স্ক্রেপার গুলো ও রাতের বেলা বিভিন্ন রঙের আলোতে  সুন্দরভাবে আলোকিত করা হয়। পেট্রোনাস টাওয়ারসের সামনের ঝরণার সামনে কিছুক্ষণ বসে থেকে তারপর গেলাম সুরিয়া কেএলসিসি শপিং মলে। অনেক গুছানো বিশাল  একটা শপিং মল, কিন্তু দাম প্রায় আকাশ-ছোঁয়া। তাই কিছু না কিনে ঘুরে দেখতেই ভালো লাগলো। বিশ্বের সব বিখ্যাত ব্র্যান্ডের আউটলেট আছে এই শপিং মলে। শপিং মলে ঘোরাঘুরি শেষ করে আবার  ফিরে আসলাম হোটেলে। রাতের খাবার হোটেলেই খেলাম। খেয়ে-দেয়ে ঘুমিয়ে পরলাম রুমে গিয়ে । সারাদিন ঘুরার জন্য শরীর  ক্লান্ত ছিল। বিছানায় শুতেই ঘুমের দেশে তলিয়ে গেলাম।


  ছবি : রাতের পেট্রোনাস টাওয়ারস

সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে আজকে সারাদিন কোথায় কোথায় ঘুরবো সেটা নিয়ে ভাবছিলাম। ঢাকা থেকে আসার সময় একটা ডায়েরী নিয়ে আসছিলাম যেখানে এক সপ্তাহে ঘুরাঘুরির একটা খসড়া প্ল্যান করা ছিল। তবে ভ্রমণে যে সবকিছু প্ল্যান অনুযায়ী হবে তা কিন্তু না। আমরা যে হোটেলে ছিলাম সেখানে একজন বাঙালি ছেলে কাজ করত। আসার পর প্রথম দিনই তাকে বলেছি একটা সিমের ব্যবস্থা করে দেয়ার জন্য। হোটেলের রুমে ওয়াই-ফাই ব্যবহার করতে পারলেও বাইরে বের হয়ে ইন্টারনেট এক্সেস করতে পারছিলাম না। এমতাবস্থায় গুগল ম্যাপ ইউজ করতে পারছিলাম না। গুগল ম্যাপ ছাড়া বিদেশ বিভুঁইয়ে ঘুরাঘুরি করতে বেশ ঝামেলাই পোহাতে হয়। লোকেশন জানা, এক জায়গা থেকে আরেক জায়গার দূরত্ব,কত সময় লাগবে যেতে অথবা প্রতি কিমি তে ট্যাক্সি ভাড়া কেমন হতে পারে এসব সম্পর্কে আইডিয়ার জন্য হলেও গুগল ম্যাপ ভিনদেশে বিপদের বন্ধুই বলা চলে। আর যে কোন দেশে ঘুরাঘুরির সময় সে দেশের সিটি ম্যাপ বেশ কাজে লাগে। সুইস হোটেলে এসেই কুয়ালালামপুরের একটা সিটি ম্যাপ কালেক্ট করলাম। আর সাথে একটা ট্রাভেল গাইড যেখানে পুরো মালয়েশিয়ার ট্যুরিস্ট স্পট গুলোর বর্ণনা আর সুন্দর সুন্দর ছবি দেয়া আছে। এসব সাধারণ ফ্রি শুধুমাত্র ট্যুরিস্টদের সুবিধার কথা চিন্তা করে। দেশে ফেরার সময় এই গাইডটা সাথে করে নিয়ে আসি; ভবিষ্যতে সেখানে  আবারো কোন একদিন যাবার ভাবনা থেকে।

অতঃপর ব্রেকফাস্টের জন্য নীচে গেলাম। হোটেল থেকে খুব কাছেই একটা রেস্টুরেন্টে ব্রেকফাস্ট করলাম। এই দেশে মালয়, চাইনিজ আর ইন্ডিয়ান খাবারের ব্যাপক সমারোহ। ব্রেকফাস্ট করলাম একটা ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে। আলু পরোটা, মিক্সড ভেজিটেবল আর ডিম অমলেট দিয়ে ব্রেকফাস্টের পর চা খেলাম। খাওয়া শেষে হোটেলে ফিরে গেলাম। আর ইতিমধ্যে বাঙ্গালি ছেলেটা ডিজি কোম্পানির একটা সিম নিয়ে হাজির হল। এক সপ্তাহের প্যাকেজ আর সাথে ২৫০ মেগাবাইট ইন্টারনেট ফ্রি ছিল। যাই হোক প্ল্যান করলাম পুত্রজায়া যাবো। হোটেলের ম্যানেজার একটা ট্যাক্সি ক্যাব ঠিক করে দিল। পুত্রজায়া মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী। সব প্রশাসনিক কাজকর্ম আর সিদ্ধান্ত এখান থেকেই নেয়া হয়।আপ-ডাউন হিসাবে ট্যাক্সি ঠিক করা করা হল।মোটামুটি দেড়ঘন্টার মত লাগবে যেতে। যাওয়ার সময় দেশের অসম্ভব সুন্দর রাস্তা আর হাইওয়ে দেখতে দেখতে গেলাম। আমাদের ট্যাক্সি চালক একজন ভারতীয়,তামিল নাড়ুতে বাড়ি। অনেকদিন ধরে মালয়েশিয়াতে আছেন। বেশ ভালো ইংরেজি বলতে পারেন।কোন জায়গায় কি আছে এসবের ব্যাপারে মোটামুটি ভালোই ধারণা রাখেন। তার সাথে কথা বলে কিছু আইডিয়া পেলাম কিছু ট্যুরিস্ট স্পট সম্পর্কে।এই দেশে সাধারণত ভারতীয়দের অনেকেই ট্যাক্সি চালায় আর এতে ইঙ্কাম ও বেশ। আবার যারা চাইনিজ তাদের মধ্যে বেশির ভাগই বিভিন্ন রেস্টুরেন্টের মালিক। আর যারা মালয়েশিয়ার অধিবাসী তারা সাধারণত কিছুটা অলস প্রকৃতির; তাদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট টাকার বিনিময়ে চাইনিজরা রেস্টুরেন্টের বিজনেস শুরু করে এবং এক সময় পরিশ্রম করে ঐ রেস্টুরেন্টের মালিক হয় তারা। আবার অনেক মালয়েশিয়ার নাগরিককে দেখছি ট্যাক্সি চালিয়ে ভালো উপার্জন করতে।


পুত্র মসজিদ

 

মসজিদের ভেতর

 দেড় ঘণ্টা পর পৌঁছে গেলাম পুত্রজায়াতে। সাজানো গুছানো, ছিমছাম শহর এই পুত্রজায়া। দেখে মনে হয় কোন শিল্পী তার তুলির সুনিপুণ আঁচড়ে এই শহরকে গড়েছেন। শুধু সুবিশাল অট্টালিকা নয়, স্থাপত্যের দিক দিয়ে একটার চেয়ে আরেকটা কম সুন্দর নয়। পুত্রজায়াতে  কিছু মসজিদ ঘুরে দেখলাম, আশপাশের আরো কিছু স্থাপনা দেখলাম।এখানে হট এয়ার বেলুনে চড়ে পুরো পুত্রজায়াকে পাখির চোখে পরখ করা যায়। হট এয়ার বেলুন রাইডের ফি ৫০ রিঙ্গিত করে। রাতের বেলা পুরো পুত্রজায়া বিভিন্ন রঙের আলোতে আলোকিত করা হয়। রাতের পুত্রজায়া বেশি সুন্দর।এইবারের ভ্রমণে রাতের পুত্রজায়া দেখা হয়নি। রাতের পুত্রজায়া দেখার ইচ্ছা মনের ভেতর রেখে আবার কুয়ালালামপুরে ফিরে আসলাম।


  পুত্রজায়ার রাস্তা

 


পুত্রজায়ার রাস্তা

হোটেলে এসে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। তারপর দুপুরের খাবার খেতে গেলাম কাছের এবিসি আলী ক্যাফেতে। এত এত খাবারের সমারোহ যে কোনটা ছেড়ে কোনটা নিব সিদ্ধান্ত নিতেই কিছু সময় চলে গেল। তার উপর আবার খিদে লেগেছে প্রচন্ডরকম। মালয়েশিয়াতে খাবারের দাম বেশ কম। আর রাস্তার পাশে এত এত মজাদার স্ট্রীট ফুড থাকা সম্ভব এখানে না আসলে বুঝি জানা হত না। শুধুমাত্র স্ট্রীট ফুড  খাবার জন্য হলেও এখানে ঘুরতে আসা উচিত। দুপুরের খাবার হিসাবে নিলাম ভাত, মিক্সড ভেজিটেবলস, মুরগী আর মাছ। ঝোলসহ মুরগীর আইটেমটা এতই মজা ছিল যে আমি পরপর তিনদিন এই আইটেম দিয়ে দুপুর আর রাতের খাবার খেয়েছি। মালয়েশিয়াতে এসে এই  রেস্টুরেন্টে বেশ কয়েকবার খাওয়া  হয়েছে।

   
   সুরিয়া কেএলসিসি শপিং মল 

রেস্টুরেন্টে খেয়ে আবার হোটেলে ফিরে আসলাম। কিছুক্ষ্ণ রেস্ট নিয়ে ঠিক করলাম বিকালে শপিং মলে যাবো। মালয়েশিয়াতে কেনাকাটার জন্য বেশ কিছু শপিং মল আছে যেখানে আপনি বার্গেইন করতে পারবেন। অন্যান্য গুলোতে বার্গেইন করতে পারবেন না। দামাদামি করতে চাইলে মারদেকা স্কয়ার থেকে  ট্যাক্সি ভাড়া করে চলে যেতে পারেন চোও কিট মার্কেটে। এটা আমাদের দেশের নিউ মার্কেটের মত। বার্গেইন করে কিনতে হবে তা না হলে ঠকার সমূহ সম্ভাবনা  থাকবে। চোও কিটের একটা ওয়েট মার্কেট আছে। বিশাল মার্কেট। তাজা মাছ থেকে শুরু করে শাক-সবজি, ফল-মূল, মশলা সবকিছুই আছে। এখান থেকে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন ফল টেস্ট করে দেখা যেতে পারে। বিভিন্ন ফলের মধ্যে আছে ডরিয়ান; এটা আমাদের দেশের কাঁঠালের মত তবে গন্ধ কাঁঠালের চেয়েও বেশি। এই ফলের দাম সমগ্র মালয়েশিয়াতেই বেশি। আছে রাম্বুটান; আমাদের দেশের লিচুর মত ফল। যদি ও লিচু বেশ রসালো ফল কিন্তু রাম্বুটান এতটা রসালো নয়।আছে লাংসাত; এটা আমাদের দেশের  লটকনের মত। আরো আছে কিউয়ি নামে এক ধরনের ফল; খেতে বেশ সুস্বাদু। এছাড়া আঙ্গুর,পেঁপে, পেয়ারা, তরমুজ, স্ট্রবেরী এসব আছে। শপিং মলের মধ্যে হানিফা মার্কেটে যাওয়া যেতে পারে চকোলেট কিনতে চাইলে। অনেক ধরনের  চকোলেট আছে। আবার ফিক্সড প্রাইস কিন্ত একবারে জেনুইন প্রোডাক্ট কিনতে চাইলে কেএল সোগো তে যাওয়া যেতে পারে। সোগোতে কোন দুই নাম্বার প্রোডাক্ট রাখা হয় না। এছাড়া শপিং মলে শুধু ঘুরতে চাইলে যাওয়া যেতে পারে সুরিয়া কেএলসিসিতে। বিশাল বিশাল স্পেস নিয়ে এক একটা দোকানের এই শপিং মলে পৃথিবীর সব বিখ্যাত ব্রান্ডের দোকান রয়েছে। এছাড়া রয়েছে স্টারহিল গ্যালারী, ফারেনহাইট ৮৮, প্যাভিলিয়ন কেএল। এসব শপিং মল সাধারণত ঘুরতে ভালো লাগে কিন্তু কেনাকাটা করতে ভালো লাগে না কারণ দাম অনেক বেশি। কম দামি শপিং মলের মধ্যে আরো রয়েছে সুনেগি ওয়াং প্লাজা, বার্জায়া টাইমস স্কয়ার ও সেন্ট্রাল মার্কেট। ইলেকট্রনিক্স প্রোডাক্টের জন্য আছে লো ইয়াট প্লাজা। আবার, কেনাকাটার জন্য যাওয়া যেতে পারে চায়না টাউনে;এখানেও বার্গেইনিং করে কিনতে হবে। এই চায়না টাউনে সবসময় ভীড় লেগেই থাকে।  সন্ধ্যার পর রাস্তার দুই পাশে নানারকম স্ট্রীট ফুডের সম্ভার নিয়ে বসে মানুষজন। ট্যুরিস্টরা স্ট্রীট ফুড খাওয়ার জন্যই মূলত সন্ধ্যার পর এখানে ভীড় করতে থাকে। আবার কেনাকাটার জন্য চাইলে লিটল ইন্ডিয়াতেও যাওয়া যেতে পারে। নতুন কোন দেশে গেলে সেই দেশের অথেনটিক খাবার আর স্ট্রীট ফুডের জন্য একধরনের আবেগ কাজ করে নিজের মধ্যে। এর মাধ্যমে দেশটার মানুষজনের খাদ্যাভাস আর পছন্দ-অপছন্দ সম্পর্কে জানার সুযোগ হয়। আর তাই কোথাও গেলে সেখানে ভিন্ন ধরনের কি আইটেম পাওয়া যায় সেটা নিয়ে কিছু হোম-ওয়ার্ক করে যাই।

তথ্য:

বিভাগ:

প্রকাশ: মার্চ ২৭, ২০১৮

প্রতিবেদক: ইমতিয়াজ সিফাত

সর্বমোট পড়েছেন: 464 জন

মন্তব্য: 0 টি

বিজ্ঞাপন জন্য স্থান
(আপনার বিজ্ঞাপনের জন্য আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন)