মাসুদ রানা থেকে শাকিব খান: হিরো নাম্বার ওয়ানের গল্প!

প্রবাসীর দিগন্ত | প্রবাসীরদিগন্ত ডেস্ক : মার্চ ২৮, ২০১৮

পড়ালেখায় খুব বেশি মনযোগ ছিল না কখনও। ডানপিটে স্বভাবের ছেলেটা একদিন বন্ধুর সাথে গেলেন এক জায়গায়, সেখানে মার্শাল আর্ট শেখানো হয়। বসে বসে দেখলেন কিছুক্ষণ, জিনিসটা মাথায় ঢুকে গেল। ভর্তি হয়ে গেলেন মার্শাল আর্টের ক্লাসে। কিছুদিন চললো সেটা, এরমধ্যেই একদিন কলেজে এক বন্ধুকে নাচতে দেখে খুব হিংসা হলো, ভাবলেন, ও এত ভালো নাচতে পারলে আমি পারবো না কেন! যেই ভাবা সেই কাজ, ভর্তি হয়ে গেলেন নৃত্যপরিচালক আজিজ রেজার কাছে।

সায়দাবাদে নিজের নাচের একাডেমিতে মাসুদ রানা নামের ছেলেটাকে এক নজর দেখেই পছন্দ হয়ে গেল আজিজ রেজার। তিনি তখন এফডিসিতে পরিচিত মুখ, সিনেমায় নাচের কোরিওগ্রাফি করেন। হোমরাচোমরা পরিচালকদের সাথে মোটামুটি চেনাজানা আছে। রানা’কে তিনি বললেন সিনেমার কথা। একসময় ইঞ্জিনিয়ার হতে চাওয়া ছেলেটার সামনে রঙিন দুনিয়ার একটা হাতছানি দেখালেন আজিজ রেজা। বাবা কি বলবে, মা কি ভাববে, এসবকিছু মাথা থেকে সরিয়ে হ্যাঁ বলে দিলেন রানা। আজিজ রেজা তাকে নিয়ে এলেন ঢাকায়।

শুকনো রোগা টিংটিঙে একটা ছেলে, সিনেমায় অভিনয় করতে চায় শুনলে যে কেউ হাসবে। চেহারায় খুব আহামরি কোন বিশেষত্ব নেই, নায়কের চেয়ে বরং কমেডিয়ানের চরিত্রে ভালো মানাবে একে। আজিজ রেজা কিন্ত হাল ছাড়লেন না। রানা’র কয়েকটা ছবি তুলে দিনের পর দিন ঘুরতে লাগলেন পরিচালকদের পেছনে, কখনও সঙ্গে করে রানাকেও নিয়ে যেতেন। সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিতেন, এই যে রানা, আমার আপন ছোটভাই। একটা হোটেলের সঙ্গে মাসকাবারী চুক্তি করেছিলেন, রানা এখানে এসে যা খুশী খাবে, বিল আমার নামে উঠবে। তাতে যদি রোগাপটকা শরীরটা একটু তরতাজা হয়! সেদিনের রানা থেকে আজকের ঢালিউডের অবিসংবাদিত এক নম্বর নায়ক শাকিব খান হবার ভিত্তিটা তৈরি করে দিয়েছিলেন আজিজ রেজাই। শাকিবের ক্যারিয়ারে এই ভদ্রলোকের অবদান অপরিসীম।

 

একজন নায়ক, তার একার প্রচেষ্টায় একটা সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিকে টিকিয়ে রেখেছেন বছরের পর বছর ধরে, এমন নজির খুব বেশি নেই। অথচ শাকিব খান এই কাজটা প্রায় এক দশক ধরে করেছেন, এখনও বাংলাদেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির সাফল্য-ব্যর্থতা অনেকাংশে নির্ভর করে তার ওপরে। গত দশ-বারো বছর ধরেই তিনি ঢালিউডের ‘হিরো নাম্বার ওয়ান’। অথচ এই শাকিব খান কত অবহেলা, কত বঞ্চনা সয়েছেন ক্যারিয়ারে। শুরুর সময়টাতে অভিনয়ের পারিশ্রমিকের জন্যে ঘুরতে হয়েছে দ্বারে দ্বারে, কখনও বিনা পারিশ্রমিকেই কাজ করেছেন। শুটিঙের লোকেশনে পরিচালক, নায়িকা বা অন্য সুপারস্টারেরা গিয়েছেন বিমানে চড়ে, শাকিব গিয়েছেন বাকি ইউনিটের সঙ্গে ভাড়া করা মাইক্রোতে। চট্টগ্রামে শুটিং হবে, ট্রেনের ফার্স্ট ক্লাস কামরা রিজার্ভ করা হয়েছে, অথচ শাকিবের জায়গা হয়নি তাতে, তিনি সেকেন্ড ক্লাসেই চড়েছেন ক্রু বা প্রোডাকশন বয়দের সঙ্গে। সেই শাকিবকে ছাড়া এখন ইন্ডাস্ট্রি অচল, সেই শাকিবের শিডিউল পাবার জন্যে গত পাঁচ-সাত বছর ধরে হন্যে হয়ে ঘোরেন পরিচালকেরা!

সোহানুর রহমান সোহানের হাত ধরে সিনেমায় এসেছিলেন সালমান শাহ-মৌসুমি। সালমান তখন মারা গেছেন, ১৯৯৯ সালে সোহান নিয়ে এলেন নতুন একটা ছেলেকে। নারায়ণগঞ্জের মাসুদ রানা তখন নাম বদলে শাকিব খান হয়ে গেছেন। প্রায় একইসঙ্গে দুটো সিনেমার শুটিং শুরু করেছিলেন শাকিব, সোহানের ‘অনন্ত ভালোবাসা’, আর আফতাব খান টুলু’র ‘সবাই তো সুখী হতে চায়’। অনন্ত ভালোবাসা মুক্তি পেয়েছিল সেবছরের মে মাসে। ছবিটা ব্যবসায়িকভাবে খুব বেশি ভালো করতে পারেনি, তবে দর্শকের মনে ছোট্ট একটা জায়গা তৈরি করে নিয়েছিলেন শাকিব। সেটাই শুরু।

এরপরের যাত্রাপথটা খুব মসৃণ কিছু ছিল না। চলচ্চিত্রে তখন অশ্লীলতার ছড়াছড়ি। সেখানে একদম নতুন আনকোরা শাকিব সেসবের ছোবল থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেননি পুরোপুরি। এরমধ্যেও গোলাম, স্বপ্নের বাসর, সাহসী মানুষ চাই- এই সিনেমাগুলো যোগ হয়েছিল তার ক্যারিয়ারে। শাকিব তখনও একক তারকা হয়ে ওঠেননি, শুধু তার নামেই সিনেমা চলবে, এরকম অবস্থান তৈরি হতে সময় লেগেছে। আর শাকিবও ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করেছেন।

২০০৬ সালে চাষী নজরুল ইসলাম তাকে কাস্ট করলেন ‘সুভা’ সিনেমার জন্যে। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প থেকে বানানো সিনেমাটা শাকিবের ক্যারিয়ারের অনন্য এক সংযোজন হয়ে আছে এখনও। এই বছরটা শাকিবের জন্যে খুব স্পেশাল। সুভা’র জন্যে দারুণ প্রশংসিত হয়েছিলেন শাকিব, বাকি ছিল বাণিজ্যিক সাফল্য। এফ আই মানিকের ‘কোটি টাকার কাবিন’ সিনেমা দিয়ে সেটাও অর্জন করে নিলেন তিনি। সিনেমা হলে দারুণ সাড়া ফেললো কোটি টাকার কাবিন, দর্শক হুমড়ি খেয়ে পড়লো সিনেমাটা দেখতে। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি আয় ক্রা সিনেমাগুলোর ছোট্ট লিস্টে ঢুকে গেল সিনেমাটা। অপু বিশ্বাসের সঙ্গে তার জুটি প্রথার শুরুও হলো সেখান থেকেই।

 

ক্যারিয়ারের প্রায় বিশটা বছর পার করে এসেছেন শাকিব খান। বাংলাদেশি সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির হাল ধরেছেন শক্ত হাতে। একটা সময়ে রিয়াজ-ফেরদৌস-আমিন খানদের মতো নায়কেরা অভিনয় থেকে দূরে সরে গিয়েছেন, মৌসুমি-পূর্ণিমা-শাবনূরেরা সিনেমা থেকে দূরে সরে গিয়েছেন, মান্নার মৃত্যুর পরে তো পুরো ইন্ডাস্ট্রিতেই বড়সড় একটা ধ্বস নামার আশঙ্কা ছিল। শাকিব সেটা হতে দেননি। বছরে বারো-চৌদ্দটা করে সিনেমা করেছেন তিনি একটা সময়ে। মানের দিকে তাকানোর সুযোগ পাননি, লক্ষ্য ছিল একটাই, সিনেমা হল বাঁচাতে হবে, হল বাঁচলে ইন্ডাস্ট্রি বেঁচে থাকবে। একটা সময়ে আমাদের দেশে হাজার-বারোশো সিনেমা হল ছিল।, এখন আড়াইশোটাও নেই। এই আড়াইশোটা হলের মধ্যে অন্তত অর্ধেকের টিকে থাকার পেছনে গত দশ বছরে শাকিবের একটা বড় অবদান আছে। সেটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না।

শাকিবের সমালোচনা করার হাজারটা জায়গা আছে। নিজের চরিত্রকে ভাঙাগড়ার ব্যাপারে তার একটা অনীহা ছিল, যৌথ প্রযোজনার সিনেমায় নাম লেখানোর পরে সেটা খানিকটা কেটেছে। কিন্ত এখনও দেশীয় সিনেমাগুলোতে তার সেরা রূপটা পাওয়া যায় না। মেন্টাল-অহংকার-শুটার-আমি নেতা হবো টাইপের সিনেমাগুলো ২০১৭-১৮ সালে এসে শাকিবের নাম বা ইমেজের সঙ্গে যায় না কোনভাবেই। তার ডেডিকেশনের কোন তুলনা নেই। গতবছর মুক্তি পাওয়া নবাব সিনেমার ষোলআনা গানটার মেকিঙের ভিডিওটা ইউটিউবে দেখলেই বুঝতে পারবেন সেটা। কিন্ত দেশীয় সিনেমাগুলোতে সেই ছাপটা খুঁজে পাওয়া যায় না। পরিচালকদের ব্যর্থতা হয়তো আছে, কিন্ত শাকিবকেও এটার দায় নিতে হবে খানিকটা হলেও। সত্ত্বা’র মতো সিনেমা করে নিজেকে ভাঙতে চেষ্টা করেছেন কিছুদিন আগে, প্রশংসা পাবে সেই চেষ্টাটাও। তার আরেকটা বাজে দিক জুটি প্রথায় সেট হয়ে যাওয়াটা। একসময় অপু বিশ্বাসের সঙ্গে জুটি বেঁধে সত্তর-আশিটা সিনেমা করেছেন। এখন আরেকজনের সঙ্গে জুটি বেধেছেন, সব সিনেমাতেই তাকেই নায়িকা হিসেবে চাইছেন। দর্শক একঘেয়েমিতে ভুগতে পারে, এই জিনিসটা শীর্ষ নায়ক হিসেবে তার মাথায় রাখা উচিত অবশ্যই।

 

একটা সময়ে শাকিবকে কটাক্ষ করে অনেকেই বলতেন, শাকিব রিক্সাওয়ালা-গার্মেন্টস কর্মীদের নায়ক, এই শ্রেণীর দর্শক ছাড়া আর কেউ নাকি তার সিনেমা দেখেন না। যৌত প্রযোজনার শিকারী বা নবাব সিনেমাগুলো মুক্তি পাবার পরে স্টার সিনেপ্লেক্সে টিকেটের হাহাকার দেখেছি আমি, তাও সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে। ছুটির দিনে নয়, সপ্তাহের অন্যান্য দিনে গিয়েও পাওয়া যায়নি টিকেট! সিনেপ্লেক্সে নিশ্চয়ই রিক্সাচালকেরা সিনেমা দেখতে আসেন না। আর রিক্সাওয়ালা-গার্মেন্টস কর্মী বলে যতোই কটাক্ষ করা হোক, দিনশেষে এই মানুষগুলোর অবদানেই সিনেমা তৈরি হচ্ছে, চলচ্চিত্র শিল্পটা টিকে আছে। শাকিব অবশ্য এমন ‘অপবাদ’ গর্বিতই হন। তার কথা- “একজন রিক্সাচালক সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে দিনশেষে যদি আমার সিনেমা দেখে তৃপ্তি পায়, সেটা আমার জন্যে বিশাল একটা পাওনা।”

মেঘে মেঘে বেলা বয়ে যায়। উনচল্লিশে পা দিয়ে ফেললেন আজ। প্রায় দুই দশক পার করে ফেলেছেন ক্যারিয়ারের, শীর্ষস্থানে আছেন এক দশক ধরে, অথচ এখনও ঢালিউডে তার একচ্ছত্র রাজত্ব। ভালো ব্যবসার জন্যে হল মালিকেরা শাকিবের দিকে তাকিয়ে থাকেন, শিডিউলের জন্যে তার পেছনে লাইন ধরেন প্রযোজক-পরিচালকেরা। তাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো নায়ক ইন্ডাস্ট্রিতে তেমন কেউ নেই এখনও, নিজেকে বাদবাকীদের ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যেতে সিনেমা বা চরিত্র বাছাইতে আরেকটু সতর্ক হবেন শাকিব, এমন আশা করাই যায়।

তথ্য:

বিভাগ:

প্রকাশ: মার্চ ২৮, ২০১৮

সর্বমোট পড়েছেন: 1297 জন

মন্তব্য: 0 টি

সংশ্লিষ্ট সংবাদ